বাংলাদেশ

বইমেলা আয়োজন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা

13783_IMG_1240.jpeg

অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ আয়োজন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতা, বাংলা একাডেমির সময়সূচি নিয়ে বারবার অবস্থান পরিবর্তন এবং প্রকাশকদের একাংশের কঠোর অবস্থানের কারণে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী দেশের সবচেয়ে বড় এই সাংস্কৃতিক উৎসব এখন গভীর সংকটে। তিন দফা তারিখ পরিবর্তনের পর সর্বশেষ আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরুর ঘোষণা এলেও প্রকাশকদের একটি বড় অংশ তাতে বেঁকে বসেছে। রমজান মাসে মেলা আয়োজনের বিরোধিতা করে এরই মধ্যে দেড় শতাধিক প্রকাশকের স্বাক্ষরসংবলিত আবেদন জমা পড়েছে বাংলা একাডেমিতে।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) সাম্প্রতিক এক সভায় প্রকাশকরা রমজান মাসে বইমেলায় অংশ না নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের মতে, রমজানে পাঠক উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং এবাদত ও ইফতারের ব্যস্ততার কারণে মেলার স্বাভাবিক পরিবেশ ও বিক্রয় কার্যক্রম ব্যাহত হবে। প্রকাশকরা মনে করেন, বইমেলা শুধু বাণিজ্যিক আয়োজন নয়, এটি একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসব; তাই এর সময় নির্ধারণে ঐতিহ্য ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

এদিকে, নির্ধারিত সময়ে মেলা না হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রকাশক ও সংস্কৃতিসেবীদের নিয়ে গঠিত ‘অমর একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ’ আগামী ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি চত্বরে এক দিনের প্রতীকী বইমেলার ডাক দিয়েছে। এ আয়োজনের মাধ্যমে পরিষদ জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার বার্তা দিতে চাচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত সময় নির্ধারণ করে পূর্ণাঙ্গ বইমেলা আয়োজনের দাবি তোলা হচ্ছে। পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অমর একুশে বইমেলা কোনো সাধারণ অনুষ্ঠান নয়, এটি ভাষা শহীদদের স্মরণে আয়োজিত একটি ঐতিহাসিক ও আবেগঘন উৎসব। যার সঙ্গে দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চেতনা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

অন্যদিকে, ‘বৈষম্যবিরোধী সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি’ মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য বেশকিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে স্টল ভাড়া অর্ধেক করা, আগের সরকারের সুবিধাভোগী বা ফ্যাসিবাদী প্রকাশকদের স্টল না দেওয়া এবং প্যাভিলিয়ন সংস্কৃতি বাতিল করা। সংগঠনটির নেতাদের অভিযোগ, গত বছর স্টল ভাড়া কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এবারও দাবি মানা না হলে তারা মেলায় অংশ নেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।

বৈষম্যবিরোধী সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হাসান বলেন, স্টল ভাড়া কমানো এবং দালাল প্রকাশকদের প্যাভিলিয়ন বাতিল না করা হলে তারা বইমেলায় অংশ নেবেন না। তিনি জানান, গত বছর মেলার আগে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং পরে সংস্কৃতি উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হলে তারা দুজনই স্টল ভাড়া কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সে প্রতিশ্রুতি আর রক্ষা করা হয়নি।

এদিকে, মেলা পরিচালনা কমিটির প্রকাশক প্রতিনিধিদের মধ্যেও চরম মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এ কমিটিতে প্রকাশকদের প্রতিনিধি রয়েছেন ৯ জন। তবে তাদের মধ্যেও মেলা আয়োজনের সময় নির্ধারণ নিয়ে তীব্র মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। প্রতিনিধিদের মধ্যে সৃজনশীল অংশটি ঘোষিত সময়ে মেলা করার বিষয়ে তেমন আগ্রহী নয়। ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা আয়োজন সম্ভব কি না, তা নিয়ে বড় প্রকাশকরা একাধিকবার বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে অধিকাংশ প্রকাশকই রমজানে মেলা আয়োজনের বিপক্ষে মত দেন। তারা বলেন, রমজান মাসে সারাদিন রোজা রেখে পাঠকদের পক্ষে বই কেনা, মেলায় ঘোরাফেরা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মেলার স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য নষ্ট হবে।

 

 

প্রকাশকের বড় অংশের প্রস্তাব, রমজান ও ঈদের পর অন্তত ১৫ দিনের একটি পূর্ণাঙ্গ বইমেলা আয়োজন করা হোক। এতে পাঠক, লেখক ও প্রকাশক সবার জন্যই একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে। সাধারণ প্রকাশকরাও একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য, অমর একুশে বইমেলা আমাদের সংস্কৃতি ও জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে গিয়েও তারা বইমেলার পক্ষে থাকেন। তবে বাস্তবতা বিবেচনায় রমজান মাসজুড়ে বইমেলা আয়োজন করা সম্ভব নয়। এতে মেলার স্বাভাবিক আবহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

 

 

বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গফুর হোসেন বলেন, রমজান মাসে বইমেলা আয়োজনের কোনো সুযোগ নেই। তার মতে, রমজানের পর অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সময় নির্ধারণ করে মেলার আয়োজন করা হলে সবাই এতে অংশগ্রহণ করবে।

 

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বইমেলা ঘিরে সৃষ্ট সংকটের মূলে রয়েছে আরও কিছু জটিল প্রেক্ষাপট। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের কারণে বাংলা একাডেমি আগে ২০২৬ সালের বইমেলা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যাতে বাপুসের একাংশ সমর্থন দিলেও সৃজনশীল প্রকাশকরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। বর্তমানে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরু হতে চলায় অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে।

 

 

গতিধারা প্রকাশনীর প্রকাশক সাদমান শাহরিয়ার অমিয় জানিয়েছেন, ৩৪ থেকে ৩৫ বছর ধরে বইমেলায় অংশ নিলেও এবার তারা বাংলা একাডেমির কাছে স্টলের জন্য আবেদন করেননি। তার মতে, বর্তমান বাস্তবতায় রমজানের মধ্যে বইমেলার আয়োজন প্রকাশকদের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে। রমজান মাসে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও সময়সূচিতে বড় পরিবর্তন আসে। দিনের বেলায় রোজা, ইবাদত ও পারিবারিক ব্যস্ততায় সময় কাটে, আর বিকেল থেকে শুরু হয় ইফতার ও তারাবির প্রস্তুতি। ফলে এ সময়ে বইমেলায় এসে বই কেনার সুযোগ বাস্তবে খুবই সীমিত হয়ে পড়ে।

 

 

মুক্তচিন্তা প্রকাশনীর প্রকাশক সিহাব বাহাদুর বলেন, বইমেলা যদি সত্যিই আমাদের জাতীয় চেতনার প্রতীক হয়, তাহলে তার গুরুত্ব নির্বাচনের থেকেও বেশি হওয়া উচিত। অথচ দায়ভার গিয়ে পড়ে মূলত প্রকাশকদের ওপরই। তিনি বলেন, রমজান শুরু হবে ১৮ তারিখ থেকে এবং বইমেলা শুরু হবে ২০ তারিখ থেকে। রমজানে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ধর্মীয় কাজে বেশি ব্যস্ত থাকে। আবার মেলার সময় শুরু হবে দুপুর ২টা থেকে। মেলা খুলতে খুলতেই ইফতারের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাবে, এরপর তারাবির নামাজ—এ অবস্থায় আমরা কখন বই বিক্রি করব?

 

 

রমজানে বইমেলা আয়োজনের বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরে সিহাব বলেন, ১৫ রোজার পর থেকেই মানুষ ঢাকা ছাড়তে শুরু করে, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও মায়েরা। ২০ রোজার পর ঢাকা শহর প্রায় অর্ধেক ফাঁকা হয়ে যাবে। আর বই এমন কোনো জরুরি পণ্য নয় যে মানুষ বাধ্য হয়ে কিনবে। ২৭ থেকে ২৮ রোজায় মেলা শেষ হলে তখন লেবার, ভ্যান—কিছুই পাওয়া যাবে না। স্টাফরা ছুটির কথা বলবে। তখন এসব কাজের জন্য লোক কোথায় পাব?

 

 

তিনি প্রশ্ন রাখেন, এত নানাবিধ সমস্যার পরও কি আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ব বইমেলা করতে? বাংলাদেশে ঐতিহ্য রক্ষার দায় কি শুধু প্রকাশকদেরই?

 

 

তবে এত বিরোধিতার মাঝেও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম জানিয়েছেন, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি বইমেলা অবশ্যই অনুষ্ঠিত হবে। সে লক্ষ্যে এরই মধ্যে প্রস্তুতিমূলক কাজও শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রকাশকরা অংশগ্রহণ না করলেও একাডেমি নিজ উদ্যোগেই মেলার আয়োজন করবে। তার ভাষায়, অন্য কোনো বিকল্প নেই, বইমেলা করতেই হবে।

 

 

প্রতীকী বইমেলার আয়োজন নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও