
ব্রিটেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কাউন্টি ডারহামের সাবেক খনি গ্রাম হরডেন, যেখানে এক সময় হাজারো মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর ছিল রাস্তাঘাট, আজ সেখানে সারি সারি পরিত্যক্ত বাড়ি, বোর্ড লাগানো প্রবেশপথ, আর সত্যিকারের জানালার বদলে বসানো প্লাস্টিকের নকল কাঠামো। এমনই এক বাস্তবতার খোঁজে ২০২৪ সালে সেখানে যান ইউটিউব কনটেন্ট ক্রিয়েটর এলি হুইটবি, তাঁর চ্যানেলের জন্য।
১৯৮৭ সালে হরডেন কোলিয়ারি, যা একসময় ব্রিটেনের বৃহত্তম খনিগুলোর একটি ছিল, বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে অবনতি শুরু হয় এলাকার। কাজ হারিয়ে মানুষ সরে যেতে থাকে, আর ফেলে রাখা ঘরবাড়ি একে একে পরিণত হয় ভাঙাচোরা স্থাপনায়। এলির ক্যামেরায় ধরা পড়ে এমন এক রাস্তা, যেখানে অধিকাংশ বাড়িতেই দরজা-জানালা বোর্ড দিয়ে আটকানো, অনেক জায়গায় আবার আসল খোলা অংশ ঢাকতে ব্যবহার করা হয়েছে কৃত্রিম “ডেকোরেটিভ স্কিন”।
এলির সঙ্গে কথা বলেন এলাকার এক বাসিন্দা, যিনি সারা জীবন এখানেই কাটিয়েছেন। হতাশা ঝরে পড়ে তাঁর কণ্ঠে। তিনি বলেন, উপরের যেসব জানালা দেখা যাচ্ছে, সেগুলো আসলে ভুয়া, প্লাস্টিকের তৈরি আবরণ মাত্র। তাঁর দাবি, এমন একটি ভবনেও মানুষ বসবাস করছে যেখানে বিদ্যুৎ বা পানির কোনো ব্যবস্থা নেই।
রাস্তা ধরে এগোতে গিয়ে এলি দেখান, কোথাও ডাকপিয়নরা চিঠি গুঁজে দিয়েছেন নকল জানালার নিচ দিয়ে, কারণ আসল কোনো প্রবেশপথ খুঁজে পাওয়া যায়নি। একটি বাড়ির জানালা পুরোপুরি উধাও, আরেকটিতে দরজার জায়গায় এমন ভাঙা কাঠামো যে ভেতরটা স্পষ্ট দেখা যায়। এমনই এক বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই অন্ধকার ভেতর থেকে ভেসে আসে কাশির শব্দ, যা বুঝিয়ে দেয় তথাকথিত পরিত্যক্ত ঘরেও কেউ থাকেন। এতে আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত সরে যান এলি ও তাঁর সঙ্গী।
হরডেনের আবাসন সংকট নতুন নয়। ২০১৫ সালে চ্যানেল ফোর জানায়, পূর্ব ডারহাম এলাকায় প্রায় ১৬০টি বাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে। হরডেন ও ব্ল্যাকহলে ৩৬১টি সম্পত্তির দায়িত্বে থাকা হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অ্যাকসেন্ট একসময় ১৩০টি বাড়ি মাত্র এক পাউন্ডে কাউন্সিলের কাছে বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সংস্কারের বিপুল খরচের আশঙ্কায় সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি।
এলি এমন একজনের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন, যিনি বিনিয়োগ হিসেবে হরডেনে একটি বাড়ি কিনেছিলেন। তিনি জানান, জায়গাটি না দেখেই কিনেছিলেন। পরে স্থানীয় দুষ্কৃতকারীরা কাজ চলছে বুঝতে পেরে ভেঙে ঢুকে সিঁড়ি ও মেঝের তক্তা পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায়। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ নাকি উল্টো মজা করে বলেছেন, এলাকায় আর কিছু না কিনলেই ভালো।
তবে হতাশার মাঝেও আশার কথা শোনাতে চান স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ডারহাম কাউন্টি কাউন্সিলের পরিকল্পনা ও আবাসন প্রধান মাইকেল কেলেহার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, গ্রামটির মানুষের আন্তরিকতা ও উষ্ণতা দর্শনার্থীদের নজরে এসেছে জেনে তারা খুশি। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, দেশের অনেক জায়গার মতো হরডেনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। সীমিত সম্পদের মধ্যেই পুনর্জাগরণ ও কমিউনিটি প্রকল্পে সহায়তা দিতে কাউন্সিল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান তিনি।
এক সময়ের শিল্পনগরীর গর্ব বয়ে বেড়ানো হরডেন আজ যেন অতীতের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে এক পাউন্ডে বাড়ি মিললেও, নতুন জীবন গড়ে তোলা এখনও কঠিন লড়াই।