বাণিজ্য ও অর্থনীতি

ইইউ বাজারে পোশাক রপ্তানিতে এগিয়ে বাংলাদেশ

14533_IMG_6597.jpeg

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষে রয়েছে চীন। তবে গত পাঁচ বছরে রপ্তানির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছে। ইইউ বাজারে একাধিক প্রধান প্রতিযোগীর তুলনায় ভালো করেছে বাংলাদেশ।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইইউতে বাংলাদেশের বাজার অংশ দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশে। এর মাধ্যমে দেশটি ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক চাহিদা মন্থর থাকা সত্ত্বেও এই অর্জন শিল্প খাতের স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইইউয়ের পরিসংখ্যান কার্যালয়ের (ইউরোস্ট্যাট) পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সময়কালে ইইউয়ের মোট পোশাক আমদানি প্রায় ৭৩ হাজার মিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে ৯০ হাজার মিলিয়ন ইউরোতে উন্নীত হয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশ তার রপ্তানি ১৪ হাজার ২৯৫ মিলিয়ন ইউরো থেকে বাড়িয়ে ১৯ হাজার ৪১৪ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ইউরোতে নিতে সক্ষম হয়েছে। পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩৬ শতাংশ। একই সময়ে চীনের রপ্তানি বেড়েছে ২১ দশমিক ৪৮ শতাংশ, ভারতের বেড়েছে ৩৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ প্রধান প্রতিযোগীদের ছাড়িয়ে গেছে।

২০২২ সালে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৯১৮ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছায় এবং বাজার অংশ দাঁড়ায় ২২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশে। তবে ২০২৩ সালে ইউরোপে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তা চাহিদা হ্রাসের প্রভাবে রপ্তানি নেমে আসে ১৭ হাজার ৪৪৪ মিলিয়ন ইউরোতে। তবুও অংশীদারত্ব ২০ শতাংশের ওপরে ধরে রাখা সম্ভব হয়। ২০২৪ থেকে পুনরুদ্ধার শুরু হয়ে ২০২৫ সালে তা আরো জোরদার হয়েছে। ২০২৫ সালে রপ্তানি আয় বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার ৪১৪ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ইউরো, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ইউরোপ এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গন্তব্য, মোট পোশাক রপ্তানির সিংহভাগ এখানেই যায়। তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস। বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।

ইইউ বাজারে সর্বোচ্চ অংশ ধরে রেখেছে চীন। ২০২১ সালে দেশটির অংশ ছিল ৩০ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা কমে ২৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে নামলেও ২০২৫ সালে আবার বেড়ে ২৯ দশমিক ৫৪ শতাংশে পৌঁছেছে। যদিও চীন এখনো প্রথম স্থানে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন—বাংলাদেশের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যতে ব্যবধান আরো কমাতে পারে।

ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তুলনামূলকভাবে তুরস্কের বাজার অংশ ২০২৫ সালে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ, ভারতের পাঁচ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার চার দশমিক ৯৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দৃঢ় ও স্থিতিশীল।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই এই অবস্থান সম্ভব হয়েছে। তার ভাষ্য, বড়দিনের মৌসুম শেষে অর্ডার কমার আশঙ্কা থাকলেও সরবরাহের পরিমাণ বেড়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে থাকলেও ইউরোপীয় ক্রেতাদের আস্থা অটুট রয়েছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্টের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল আমার দেশকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যেও দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা তাৎপর্যপূর্ণ। কিছু প্রতিযোগী দেশে উচ্চ শুল্ক কাঠামো ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ক্রেতারা বিকল্প উৎস খুঁজছেন, যার সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, ইইউ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য, যেখানে দেশের অধিকাংশ পোশাক রপ্তানি হয়। গত দুই বছরে সামগ্রিক আমদানি প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকলেও বাংলাদেশ কয়েকটি প্রধান প্রতিযোগী দেশের তুলনায় ভালো করেছে। এটি প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, সরবরাহ চেইনের স্থিতিশীলতা এবং ক্রেতাদের আস্থার প্রতিফলন।

তিনি আরো বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধায় পরিবর্তন আসবে। সে প্রেক্ষাপটে ইইউ বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করা, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ টেকসই বিনিয়োগ শক্তিশালী করতে হবে।

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বর্তমানে দেশে ব্যবসাবান্ধব সরকার এসেছে। এই সরকারকে দ্রুত ইইউয়ের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এতে এলডিসি উত্তরণের পরও ইইউয়ের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে সহায়ক হবে।

নীতি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থায় অগ্রগতি ইউরোপে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করেছে। পরিবেশবান্ধব কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ক্রেতাদের আস্থা বেড়েছে। ইইউয়ের গ্রিন নীতিমালার প্রেক্ষাপটে পানি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সাশ্রয় ও বর্জ্য পুনর্ব্যবহার উদ্যোগ বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তবে সংস্থাটির মতে, ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি।

গত পাঁচ বছরে শীর্ষ প্রবৃদ্ধি অর্জন, প্রতিযোগিতাপূর্ণ বৈশ্বিক পরিবেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সক্ষমতার প্রতিফলন। ইউরোপের বাজারে এই ধারাবাহিক অগ্রগতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে মনে করছেন রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও