মধ‍্যপ্রাচ্য

ড্রোন দিয়েই শত্রুদের কপোকাত করছে ইরান

14573_IMG_5766.jpeg

এ সত্যিই এক অসম ও অন্যায় যুদ্ধ, যা ইরানের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। বিশ্বের এক নম্বর সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার প্রধান সহচর ইসরাইলের সর্বাধুনিক সমরাস্ত্রের বিরুদ্ধে ইরান রীতিমতো প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে দামে সস্তা কিন্তু কাজে সফল ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে।

নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বহুল আলোচিত ইরানের এই ড্রোন মার্কিন ও ইসরাইলি সমরবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। প্রতিদিন শত শত শাহেদ ১৩৬ ড্রোন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তাদের সমর্থনকারী উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করছে।

শত চেষ্টা করেও ড্রোনগুলোকে আকাশে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা যাচ্ছে না। মার্কিন জেনারেলরা বিষয়টি এখন স্বীকার করে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান মার্কিন জেনারেলদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সম্পদ লক্ষ্য করে ইরান যেসব ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, সেগুলোর প্রতিটি নিখুঁতভাবে ভূপাতিত করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নাও থাকতে পারে। ক্যাপিটাল হিলে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এমন আশঙ্কার কথাই জানিয়েছেন মার্কিন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা।

মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন মার্কিন কংগ্রেসম্যানদের জানান, ইরান বর্তমানে হাজার হাজার আত্মঘাতী ড্রোন মোতায়েন করেছে। মার্কিন বাহিনীর অধিকাংশ ড্রোন ধ্বংস করার সক্ষমতা থাকলেও ঝাঁকে ঝাঁকে আসা এসব ড্রোনের সবকটিকে ঠেকানো হয়তো সম্ভব হবে না।

মার্কিন সমরবিদরা বলছেন, এ এক জটিল পরিস্থিতি। এখন ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত ঠেকানোর চেয়ে বরং সেগুলোর লঞ্চিংপ্যাড, অর্থাৎ উৎক্ষেপণস্থলগুলো যাতে দ্রুত ধ্বংস করা যায় সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে দ্য গার্ডিয়ান আরো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান তাদের স্বল্পমূল্যের শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করছে। অত্যন্ত নিচু দিয়ে ও ধীরগতিতে ওড়ার কারণে এসব ড্রোন সাধারণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে ব্যালিস্টিক মিসাইলের চেয়েও অধিকতর কার্যকর।

মার্কিন প্রশাসনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা ইরানের চতুর কৌশলের প্রসঙ্গ তুলে ধরে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল প্যাট্রিয়ট ও থাড ইন্টারসেপ্টর মিসাইলগুলোকে নিঃশেষ করার কৌশল নিয়েছে ইরান।

ক্যাপিটাল হিলের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কংগ্রেসের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ইরানি ড্রোন ঠেকাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবান ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। জেনারেল কেইন ব্যক্তিগতভাবে এ উদ্বেগের সঙ্গে একমত হলেও কংগ্রেসম্যানদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, এখনো আমাদের যথেষ্ট মজুত রয়েছে।

মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, চলমান এই যুদ্ধের ব্যয় রীতিমতো আকাশচুম্বী। ইরানে হামলার শুরুর দিন থেকে প্রতিদিন গড়ে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দুদিন ব্যয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় চার বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে ইরানি ড্রোন তৈরি করতে গড়ে খরচ হয় ৩৫ হাজার ডলারের মতো। অথচ এই ড্রোন ভূপাতিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করে ইন্টারসেপ্টর প্যাট্রিয়ট অথবা থাড। এর প্রতিটির উৎপাদন খরচ আড়াই থেকে তিন বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকরা আরো বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনন্তকাল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যে কথা বলেছেন, তা বাস্তবতাবিবর্জিত।

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিরক্ষা সম্পাদক শশাঙ্ক জোশি ইরানের যুদ্ধকৌশলকে তাৎপর্যপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ইরান মূলত রাশিয়াকেই অনুসরণ করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া যেমন ড্রোনের ওপর বেশি নির্ভর করেছে, ইরানও এ যুদ্ধে ঠিক সে কৌশলটিই নিয়েছে।

জোশি মনে করেন, ইরান যে কার্যকর ড্রোন উদ্ভাবন করেছে, তার পেছনে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সহায়তা রয়েছে। ড্রোন ব্যবহার করে ইরান এখন মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি উপসাগরীয় জোটভুক্ত দেশগুলোর ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে শত শত শাহেদ ড্রোন উৎক্ষেপণ করছে।

জোশি আরো বলেন, বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে ইরান ইতোমধ্যে প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করেছে। পাশাপাশি ইরান তার সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে। ইরান শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলেই নয়, এর বাইরে সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটেনের একটি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়ে বার্তা দিয়েছে যে, ইরানের কাছে কেবল স্বল্প ও মাঝারিপাল্লার নয়, বরং দূরপাল্লার ড্রোনও মজুত রয়েছে। সুতরাং তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সহজে জয়লাভ করবে, তা বলার উপায় নেই। বরং বলা যায়, সংঘাত অব্যাহত থাকবে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

ফক্স নিউজের ‘ইরানের ড্রোন হামলায় যুদ্ধব্যয় বাড়ছে এবং দীর্ঘায়িত হচ্ছে যুদ্ধ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে একজন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেছেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন ড্রোন অভিযান চালাচ্ছে। এর খরচ খুবই কম, একমুখী আক্রমণাত্মক, যা পশ্চিমাদের একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তেহরান অঞ্চলজুড়ে হাজার হাজার শাহেদ ড্রোন মোতায়েন রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ এসব ড্রোনের মজুতের ফুটেজ ইতোমধ্যেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ড্রোন নির্মাতা প্রযুক্তি কোম্পানি ড্রাগনফ্লাইয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যামেরন চেল বলেছেন, ড্রোন ব্যবহার করে ইরানের যুদ্ধকৌশলটি উচ্চমানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিতান্ত সস্তা প্রযুক্তির হুমকি মোকাবিলায় বাধ্য করছে।

চেল ফক্স নিউজকে আরো বলেন, ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মাঝে ইতোমধ্যেই ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। শুধু ড্রোন দিয়ে এমন তাণ্ডব চালানো যায় তা অতীতে কখনো কল্পনাও করা হয়নি। ইরানিরা এই ড্রোন দিয়ে যুদ্ধে হয়তো জয়লাভ করতে পারবে না; কিন্তু এই ড্রোন প্রযুক্তির রয়েছে একটি অসম ক্ষমতা, যা এই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে এবং রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারবে।

সামরিক বিশেষজ্ঞ স্টিভ ফেল্ডস্টাইন বলেছেন, বর্তমান যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্ব ড্রোন যুদ্ধের একটি নতুন যুগে প্রবেশ করছে। কারণ, এই সংঘাতের ক্ষেত্রে মানববিহীন বিমান তথা ড্রোনের ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়ছে।

তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন খুবই কার্যকর। তবে এই ড্রোনকে ভূপাতিত করতে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এ অঞ্চলে সীমাহীন নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত গড়ে তোলা।

এদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ড্রোন হামলা তাদের শক্তিশালী পদক্ষেপ। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনায় অব্যাহতভাবে ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে। কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, তারা প্রতিনিয়ত ড্রোন হামলার মুখোমুখি হচ্ছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ সৌদি তেল শোধনাগারের ওপর পড়ে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটিয়েছে।

ইরানি ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক পানিসীমায় অবস্থানরত ইরানি নৌজাহাজে সাবমেরিন হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছাকাছি আন্তর্জাতিক পানিসীমায় একাধিক ইরানি জাহাজে সাবমেরিন হামলা চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক পানিসীমায় কাউকে লক্ষ্যবস্তু করা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক পানিসীমায় হামলার ঘটনা ঘটল।

গত শনিবার শুরু হওয়া এই অসম যুদ্ধ কবে শেষ হবে, এর পরিণামই বা কী হবে সে প্রশ্নই এখন আসছে ঘুরেফিরে। যুদ্ধ কবে বন্ধ হবে, সে প্রশ্নের উত্তর এ মুহূর্তে কারো জানা নেই। নিরাপত্তা বিশ্লেষক দীনেশ কে ভি বলেছেন, নেতানিয়াহু ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইছেন ইরান হার স্বীকার করুক। তখন যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে।

কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথানত করা ইরানি জাতির ডিএনএতে নেই। ইরানের কাছে এ মুহূর্তে ৮০ হাজারের মতো ড্রোন মজুত রয়েছে। দেশটি প্রতিদিন ৪০০-৫০০ ড্রোন ব্যবহার করছে। অর্থাৎ, ইরান শুধু ড্রোন দিয়েই ছয় মাস এই যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে।

অন্যদিকে প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত কমে আসছে। আগামী এক মাসের মধ্যে মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু শেষ হবে না ড্রোনের মজুত।

দীনেশ কে ভি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তাদের মিত্রদের প্রতিদিন এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। ইরান যদি এই যুদ্ধকে ছয় মাস ধরে রাখতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তাদের উপসাগরীয় মিত্ররা নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। আসলে এ যুদ্ধে কখনো হারবে না ইরান, জিতবে না যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও