বাংলাদেশ

জঙ্গল সলিমপুরে চিরুনি অভিযানে অধরা মূল হোতারা

14634_IMG_6226.jpeg

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর বিশেষ চিরুনি অভিযানে অধরাই রয়ে গেছে মূল হোতারা। তারা গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে।

সোমবার (৯ মার্চ) ভোর ৬টা থেকে শুরু হওয়া অভিযান বিকেল পর্যন্ত চলে। ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে যৌথবাহিনী। ভোরের এমন চিত্র দেখ হতভম্ব হয়ে যান স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রশাসনিক কাঠামোতে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে। বায়েজিদ লিঙ্ক রোড দিয়ে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে ডান দিকে জঙ্গল ছলিমপুর। এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে বসানো হয়েছে তল্লাশিচৌকি, যাতে অভিযান শুরুর পর কেউ পালিয়ে যেতে না পারে।

যৌথবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে অভিযানে অংশ নিয়েছেন। অতীতে এলাকাটিতে অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবারের অভিযানে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। এ সময় চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন সরেজমিনে উপস্থিত থেকে সার্বিক অভিযান তদারকি ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এছাড়াও ৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রাম জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) রাসেল কালবেলাকে বলেন, অভিযানে যৌথ বাহিনীর চার হাজার সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৮৭ জন সদস্য, জেলা পুলিশের ১৪৬ জন সদস্য, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) এর ৮০০ জন সদস্য, আরআরএফ চট্টগ্রামের ৪০০ জন সদস্য, ফেনী জেলা পুলিশের ১০০ জন সদস্য, পার্বত্য জেলার ৩০০ জন সদস্য, এপিবিএন ৩৩০ জন সদস্য, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর ১২২ জন সদস্য এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) এর ৩৭১ জন সদস্যসহ সর্বমোট ৩ হাজার ১৮৩ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও অভিযানকে কার্যকর ও নিরাপদভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ৩টি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি, র‌্যাব ও সিএমপির তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষ কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে যৌথবাহিনীর সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ি ও দুর্গম স্থানে একযোগে অবস্থান গ্রহণ করে চিরুনি তল্লাশি শুরু করেন। সন্দেহভাজন আস্তানা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, পাহাড়ি পথ, গোপন স্থাপনা এবং অপরাধীদের সম্ভাব্য অবস্থানসমূহে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে মোট ১২ জনকে আটক করেন। তল্লাশিকালে আগ্নেয়াস্ত্র ২টি (পিস্তল ০১টি ও এলজি ০১টি), কার্তুজ ৪টি, ককটেল (বিস্ফোরক) ১১টি, দেশীয় অস্ত্র ১৭টি, সিসি ক্যামেরা ১৯টি, ডিভিআর ২টি, পাওয়ার বক্স ১টি ও ২টি বাইনোকুলার উদ্ধার করা হয়।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জঙ্গল সলিমপুরে দুপক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। একই ঘটনায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, যা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বেপরোয়া আচরণের প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। গত জানুয়ারিতে অভিযান চালানোর সময় র‍্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন।

এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করা হয় এবং আরও ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, র‍্যাব সদস্যরা আসামি ধরতে গেলে তাদের ওপর ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানো হয়, একটি আসামি ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং চার র‍্যাব সদস্যকে অপহরণ করা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।

সোমবার ভোরে শুরু হওয়া অভিযানের সময় পাহাড়ি অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। কোথাও রাস্তার ওপর ট্রাক রাখা হয়েছে, কোথাও কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে, নালার স্ল্যাবও তুলে ফেলা হয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ধাপে ধাপে অভিযান অগ্রসর হয়।

অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগেই পেয়েছেন জঙ্গল সলিমপুরে থাকা সন্ত্রাসীদের একটি অংশ, তাই গত রাতেই এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়।

তথ্যমতে, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া এক র‍্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় রয়েছে তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভিযানের আগে যেসব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে এর উদ্দেশ্য আলীনগরে যৌথবাহিনীর প্রবেশ ঠেকানো। আলীনগরে প্রবেশের মূল রাস্তাতেই ট্রাকটি রাখা হয়। কালভার্টটিও আলীনগরের কাছে। অভিযান পরিচালনার সময় সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁজোয়া যানও রাখা হয়েছে বায়েজিদ লিঙ্ক রোড এলাকায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগেই পেয়েছেন জঙ্গল সলিমপুরে থাকা সন্ত্রাসীদের একটি অংশ। তাই অভিযানের আগে গতকাল রাতেই এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন সন্ত্রাসীরা।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বাধা দিতে ছিন্নমূলের পর আলী নগরের শুরুতে একটি বড় ট্রাক আড়াআড়ি করে রেখে দেওয়া হয়েছে। কিছু দূরে খালের ওপর কালভার্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো গাড়ি প্রবেশ করতে না পারে। খালে ইটবালি সিমেন্ট দিয়ে ভরাট করে গাড়ি প্রবেশ করানো হয়েছে I অভিযান শুরুর আগে কীভাবে এসব ঘটল জানতে চাইলে নাজমুল হাসান বলেন, এটি অনেক বড় অভিযান। এখানে বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন আছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সিএনজি অটোরিকশার চালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সোর্স রয়েছে। কোনোভাবে হয়তো জেনে গেছে। গত ১৯ জানুয়ারি অভিযানে গিয়ে নিহত হয় র‌্যাব সদস্য মোতালেব। পরে আবার নতুন করে আলোচনায় আসে জঙ্গল সলিমপুর। নিহতের জানাজায় এসে র‌্যাব প্রধান এ কে এম শহীদুর রহমান জঙ্গল ছলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে থাকায় ওই সময় আর অভিযান চালানো হয়নি। চট্টগ্রাম জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) রাসেল কালবেলাকে জানান, উদ্ধারকৃত আলামতসমূহ প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা, এলাকায় নজরদারি স্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতো। অভিযান পরিচালনাকালে কোনো প্রকার হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং সার্বিক পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, অভিযান শেষে জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল ও আলীনগর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে উক্ত এলাকায় দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। ২০২২ সালে এ খাস জমি দখলমুক্ত করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ, ইকো পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা করার পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। তখন উচ্ছেদ অভিযানে বারেবারে বাধার মুখে পড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। টানা উচ্ছেদ অভিযানে সেখানে ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা ক্যাম্প ও চেকপোস্ট’ বসিয়েছিল জেলা প্রশাসন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সেখানে আবারও ‘স্থানীয় সন্ত্রাসীদের’ তৎপরতা বেড়ে যায়। কয়েকবার সংঘর্ষ ও খুনোখুনি ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের আলিনগর এলাকায় ইয়াছিন ও রোকন-গফুর বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। তখন গুলিবিদ্ধ হয়ে রোকন বাহিনীর এক সদস্য নিহত হন। আহত হন বেশ কয়েকজন। এ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে সাংবাদিকরা সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয়দের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও