
লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের “ইইউতে ফেরা অনিবার্য” ঘোষণা এবং সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং-এর ব্রেক্সিটকে “catastrophic mistake” বলে বর্ণনা ব্রিটিশ রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। ২০১৬ সালের গণভোটের প্রায় দশ বছর পর লেবার পার্টির প্রভাবশালী নেতারা আবার সক্রিয়ভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের বিতর্ককে উসকে দিয়েছেন।
সাদিক খান স্পষ্টভাবে বলেছেন, লেবার যদি আগামী নির্বাচনে জয়ী হয় তাহলে যুক্তরাজ্য ইইউতে ফিরবে। তিনি বলেন, “কেন অনিবার্যকে বিলম্বিত করব?” ওয়েস স্ট্রিটিংও ব্রেক্সিটকে বিপর্যয়কর ভুল বলে অভিহিত করে ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য পূর্ণ সদস্যপদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন।
এই পুনরুত্থানের পেছনের বাস্তবতা:
এই বক্তব্যগুলো কোনো আকস্মিক আবেগপ্রসূত নয়, বরং লেবার পার্টির বর্তমান রাজনৈতিক সংকটেরই প্রতিফলন। স্থানীয় নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়া, কীর স্টারমারের নেতৃত্বে জনপ্রিয়তার ঘাটতি এবং দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন লেবারকে পুরনো ইস্যুতে ফিরিয়ে এনেছে। একদিকে প্রগতিশীল ভোটারদের আকৃষ্ট করা, অন্যদিকে দলের মধ্যে নতুন গতি সৃষ্টি করা,এটি তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলে মনে হয়।
তবে এই অবস্থানের মধ্যে একটি গুরুতর দ্বন্দ্ব রয়েছে। ব্রেক্সিট ছিল ব্রিটিশ জনগণের সরাসরি গণভোটের ফলাফল। সেই গণতান্ত্রিক রায়কে এক দশক পর “ভুল” বলে অস্বীকার করা শুধু রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বরং জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বিরোধীদের দৃষ্টিকোণ ও ভবিষ্যৎ প্রভাব:
কনজারভেটিভ পার্টি এবং রিফর্ম ইউকে এই বিতর্ককে বড় রাজনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখছে। রিফর্ম ইউকে বিশেষ করে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট-সমর্থক এলাকাগুলোতে এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে তাদের অবস্থান আরও মজবুত করতে পারবে। তারা যুক্তি দিচ্ছে যে, লেবার জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
বাস্তবতা হলো, ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কিন্তু ইইউতে ফিরে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে,এমন সরলীকরণও ঠিক নয়। অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন বাণিজ্যনীতির মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের জন্য শিক্ষা:
এই বিতর্ক বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও গভীর তাৎপর্য বহন করে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন নীতি নির্ধারণের সঙ্গে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটের সুবিধার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া আধুনিক বিশ্বের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ। ব্রিটেনের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, একবার গৃহীত গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে পুনরায় চ্যালেঞ্জ করার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অত্যন্ত ভারী হতে পারে।
ব্রেক্সিটের রাজনীতি এখনো শেষ হয়নি। বরং এটি ব্রিটিশ সমাজের গভীর বিভাজন এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নিয়ে চলমান সংগ্রামেরই প্রতিফলন।
-নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল
আইনজীবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক