
অবৈধভাবে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশে সহায়তা করতে দেশটির নিবন্ধিত বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হচ্ছে বলে এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। BBC-এর গোপন তদন্তে দেখা গেছে, মানবপাচারকারীরা অভিবাসীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ ও পাচারের জন্য যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানির অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে।
তিন মাসব্যাপী এই অনুসন্ধানে দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের উলউইচ এলাকার একটি মোবাইল ফোনের দোকানে গোপনে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, দোকানের কর্মীরা এক আন্ডারকভার গবেষককে জানাচ্ছেন যে প্রায় তিন হাজার পাউন্ড নগদ জমা দিলে সেটি ফ্রান্সে অবস্থানরত এক মানবপাচারকারীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। দোকানটির এক কর্মী বলেন, “আপনি এখানে টাকা জমা রাখবেন। আপনার লোকজন যুক্তরাজ্যে পৌঁছে গেলে তখন আর ফিরে আসার প্রয়োজন হবে না।”
তদন্তে উঠে এসেছে, ফ্রান্সভিত্তিক এক পাচারকারী, যে নিজেকে “আহমাদ” নামে পরিচয় দেয়, সে যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে নিউক্যাসল আপন টাইনে অবস্থিত একটি পাইকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কেমব্রিজশায়ারের একটি কার ওয়াশ। এছাড়া বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে একটি কার ওয়াশ ও ফ্রান্সের প্যারিসের একটি রেস্তোরাঁসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নগদ অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও জানানো হয়।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এক গবেষককে ফ্রান্সের ডানকার্ক শহরের অভিবাসী শিবিরে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি সন্তানসহ যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক এক অভিবাসীর ছদ্মবেশ নেন। স্থানীয়ভাবে “দ্য জঙ্গল” নামে পরিচিত ওই শিবিরে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানবপাচারচক্রের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেখানে “জিয়া” নামের আরেক পাচারকারী ছোট নৌকায় চ্যানেল পারাপারের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেয়। পাচারকারীরা এই যাত্রাকে “গেম” নামে উল্লেখ করে থাকে।
জিয়া গবেষককে জানায়, লন্ডনের কিছু মানি এক্সচেঞ্জ দোকানের মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়া সম্ভব এবং যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর সেই অর্থ পাচারকারীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে “আহমাদ” নামের পাচারকারী জানায়, দুইজনের চ্যানেল পারাপারের খরচ হবে ২ হাজার ৭০০ পাউন্ড।
পরবর্তীতে বিবিসির গবেষক উলউইচের ওই মোবাইল ফোনের দোকানে তিনবার যান এবং গোপনে কথোপকথন ধারণ করেন। সেখানে দোকানের এক কর্মী জানান, অভিবাসীরা নিরাপদে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পরই টাকা পাচারকারীদের কাছে পাঠানো হবে। তিনি আরও বলেন, “যদি তারা পার হতে না পারে এবং আমাকে টাকা ফেরত দিতে বলে, আমি ফেরত দেব।” তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন যে নৌযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময় থাকে।
পরে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে দোকানটির কর্মীরা মানবপাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তারা দাবি করেন, এটি কেবল একটি মোবাইল ফোনের দোকান এবং তারা কোনো অর্থ স্থানান্তরের কাজ করে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা দেখায় যে মানবপাচারচক্র এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং প্রকাশ্যেই আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করছে। Royal United Services Institute-এর অর্থ ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক Tom Keatinge বলেন, অপরাধচক্রের এমন “স্পর্ধিত আচরণ” উদ্বেগজনক। তার মতে, তারা বিশ্বাস করছে যে খুব সহজেই নজরদারি এড়িয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।
যুক্তরাজ্য সরকার দীর্ঘদিন ধরেই মানবপাচারচক্রের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার কথা বলে আসছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সন্দেহভাজন পাচারকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী Keir Starmer বলেছিলেন, “যদি অর্থনির্ভর কোনো চক্রকে ধ্বংস করতে চান, তাহলে অর্থের উৎস অনুসরণ করতে হবে।”
তবে বাস্তবে পাচারচক্রের অর্থ জব্দে কর্তৃপক্ষ খুব বেশি সফল নয়। যুক্তরাজ্যের Crown Prosecution Service-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর থেকে দোষী সাব্যস্ত মানবপাচারকারীদের কাছ থেকে অর্জিত অর্থের মাত্র ১০ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আদালতের হিসাবে ৪৫ জন পাচারকারী তাদের অপরাধের মাধ্যমে ১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ডের বেশি আয় করেছে, কিন্তু জব্দের আদেশ হয়েছে মাত্র ২৯ লাখ পাউন্ডের সম্পদের ওপর। এর মধ্যেও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উদ্ধার করা গেছে মাত্র ১৬ লাখ পাউন্ড।
এদিকে National Crime Agency জানিয়েছে, মানবপাচার নেটওয়ার্ক দমনে তারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সম্পদ ও জনবল ব্যবহার করছে। সংস্থাটির উপপরিচালক Dan Cannatella-Barcroft বলেন, বর্তমানে প্রায় ১০০টি সক্রিয় তদন্ত চলছে এবং যুক্তরাজ্যকে পাচারকারীদের জন্য আরও কঠিন পরিবেশে পরিণত করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী Mike Tapp বলেন, অর্থ স্থানান্তরের বিষয়গুলো নিয়ে নেপথ্যে বিস্তর তদন্ত চলছে। তবে চলমান তদন্তের স্বার্থে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার মতে, অপরাধচক্রগুলো প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল বদলাচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।