
চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত অন্তত ২০টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত তথ্যের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক এবং গুরুতর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর ইরান সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, বাহরাইন ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও যৌথ সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালায়। এতে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, নজরদারি বিমান এবং জ্বালানি সরবরাহ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তেহরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাব হিসেবেই এসব আঘাত হানা হয়েছে। অন্যদিকে পেন্টাগন জানিয়েছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্প্রতি এক বিবৃতিতে দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো আর নিরাপদ নয়। তিনি বলেন, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং ভবিষ্যতে তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে।
স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল রুওয়াইস ও আল সাদের বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিটি থাড ব্যাটারি তৈরি করতে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় এবং এগুলো পরিচালনার জন্য শতাধিক সেনাসদস্য প্রয়োজন হয়।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ফলে এগুলোর ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও বড় ধাক্কা।
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতেও ইরানি হামলায় মার্কিন নজরদারি ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা একটি ক্ষতিগ্রস্ত বিমানকে ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমান হিসেবে শনাক্ত করেছেন, যার প্রতিস্থাপন ব্যয় কয়েকশো মিলিয়ন ডলার হতে পারে।
কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি ও ক্যাম্প আরিফজানেও একাধিক হামলার চিহ্ন পাওয়া গেছে। সেখানে জ্বালানি সংরক্ষণ বাঙ্কার, বিমান হ্যাঙ্গার এবং সেনা আবাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থারও ব্যাপক ক্ষতির প্রমাণ মিলেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের এক হিসাব অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মোট ব্যয় প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর বড় অংশই ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম মেরামত ও প্রতিস্থাপনে ব্যয় হতে পারে। তবে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের দাবি, প্রকৃত ব্যয় এর চেয়েও বেশি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে অন্তত ৪২টি সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এফ-১৫ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং এ-১০ আক্রমণকারী বিমান।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তুলনামূলকভাবে কম খরচের এবং সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য ড্রোন ব্যবহার করে ব্যয়বহুল মার্কিন সামরিক সম্পদের ওপর আঘাত হানার কৌশল গ্রহণ করেছে। যুদ্ধের শুরুতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিবর্তে পরবর্তীতে তারা নির্দিষ্ট ও উচ্চমূল্যের লক্ষ্যবস্তুতে আরও নিখুঁত আক্রমণ চালাতে শুরু করে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. কেলি গ্রিয়েকো বলেন, যুদ্ধের প্রথম দিকে ইরান বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পরে তারা কৌশল পরিবর্তন করে সীমিত কিন্তু নির্ভুল হামলার দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
এদিকে মার্কিন কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে এসব তথ্যের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো আবারও বড় ধরনের হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন করে হামলা শুরু হলে আগের তুলনায় প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম থাকতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংঘাত আবার তীব্র হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।