
লন্ডনের পূর্বাঞ্চলে প্রেমিকাকে নির্মমভাবে হত্যা করে পরে বাড়িতে গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটানোর ঘটনায় ৪৫ বছর বয়সী ক্লিফটন জর্জকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। বুধবার স্নেয়ার্সব্রুক ক্রাউন কোর্টের জুরি প্রায় আড়াই ঘণ্টা আলোচনা শেষে এই রায় ঘোষণা করে।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ক্লিফটন জর্জ তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী ৪৬ বছর বয়সী অ্যানাবেল রুককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। নিহত অ্যানাবেল রুক ছিলেন একজন দাতব্য সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং অবসরপ্রাপ্ত ওল্ড বেইলি বিচারক পিটার রুকের কন্যা। প্রায় ১০ বছরের সম্পর্কের ইতি টানার কথা জানানো এবং আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। সেই বিরোধের একপর্যায়ে জর্জ প্রথমে তাকে আঘাত করেন, পরে শ্বাসরোধের চেষ্টা করেন এবং শেষে রান্নাঘর থেকে ছুরি এনে ৩১ বার আঘাত করে হত্যা করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে এবং প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে জর্জ বাড়ির বেসমেন্টে আগুন লাগিয়ে একটি গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটান। বিস্ফোরণের তীব্রতায় স্টোক নিউইংটনের ডুমন্ট রোডের বাড়িটির একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং ছাদের অংশ উড়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা বিস্ফোরণের শব্দকে ‘ছোটখাটো ভূমিকম্পের’ সঙ্গে তুলনা করেন।
২০২৪ সালের ১৭ জুন ভোরের কিছু আগে বিস্ফোরণের খবর পেয়ে পুলিশ ও দমকলকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে জর্জকে রক্তাক্ত অবস্থায় রান্নাঘরের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। এ সময় তিনি ভাঙা কাঁচের টুকরো দিয়ে নিজেকে আঘাত করারও চেষ্টা করেন। অন্যদিকে অ্যানাবেল রুকের নিথর দেহ পড়ে ছিল বাড়ির বসার ঘরে।
বিচার চলাকালে জর্জ হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন যে তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং ঘটনার অনেক কিছুই তার মনে নেই। তবে বিচারক মি. জাস্টিস কনস্টেবল কেসি তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, হামলার মাঝপথে গিয়ে ছুরি এনে আবার ফিরে এসে আক্রমণ চালানো একটি সচেতন ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ, যা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানোর দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে আসে যে ক্লিফটন জর্জ দীর্ঘদিন ধরেই রাগী, কর্তৃত্বপরায়ণ এবং মানসিকভাবে নির্যাতনমূলক আচরণ করতেন। অ্যানাবেল রুকের বন্ধু ও স্বজনরা জানান, সামান্য বিষয় নিয়েও তিনি প্রচণ্ড রেগে যেতেন এবং প্রায়ই অপমানজনক আচরণ করতেন।
অ্যানাবেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সিয়ান ডেভিন আদালতে বলেন, জর্জের ‘অযৌক্তিক ও বিস্ফোরক রাগ’ ছিল এবং তিনি অ্যানাবেলকে অপমান, গ্যাসলাইটিং ও শারীরিকভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন। এক ঘটনায় তিনি অ্যানাবেলকে দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে গলা চেপে ধরেছিলেন বলেও আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া হয়।
আরেক বন্ধু ড্যানিয়েল ভারানি জানান, জর্জের ক্রমাগত রাগান্বিত আচরণ ও চিৎকার-চেঁচামেচির কারণে তিনি একসময় তাদের বাসা ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। আদালতে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালে গ্লাস্টনবেরি উৎসবে তুচ্ছ একটি বিষয় নিয়ে জর্জ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি একবার অ্যানাবেল তার রান্নার ছুরিগুলো ধুয়ে শুকাতে রেখে দেওয়ায়ও তিনি প্রচণ্ড রাগান্বিত হন।
২০২৩ সালে অ্যানাবেল তার বাবাকে জানিয়েছিলেন যে জর্জের সঙ্গে বসবাস করা ‘ডিমের খোসার ওপর হাঁটার’ মতো। তিনি সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার কথাও বিবেচনা করছিলেন। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি তার বোনকে পাঠানো এক বার্তায় লিখেছিলেন, এই সম্পর্ক আর টেকসই নয় এবং সামনে আরও রোষের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
আদালতে জানা যায়, সম্পর্ক শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও অ্যানাবেল মানবিক কারণে জর্জকে নতুন বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে ৫০ হাজার পাউন্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ভবিষ্যতে বন্ধু হিসেবে যোগাযোগ রাখারও আশা করেছিলেন তিনি।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে উইলিয়াম এমলিন জোন্স কেসি বলেন, জর্জ প্রথমে অ্যানাবেলকে আঘাত করেন, পরে শ্বাসরোধের চেষ্টা করেন এবং শেষে ছুরি এনে তাকে হত্যা করেন। এটি ছিল রাগের বশে সংঘটিত একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
রায় ঘোষণার সময় জর্জ সামান্য মাথা নাড়লেও বিশেষ কোনো আবেগ প্রকাশ করেননি। তবে আদালতে উপস্থিত অ্যানাবেলের বন্ধু ও স্বজনদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
রায়ের পর ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের আইনজীবী ক্যাথরিন গুল্ড বলেন, অ্যানাবেল রুক ছিলেন একজন সহানুভূতিশীল ও মানবিক ব্যক্তি, যিনি গৃহস্থালি ও যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের সহায়তায় কাজ করতেন। তার জীবন এমন একজন মানুষের হাতে নির্মমভাবে শেষ হয়েছে, যাকে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকে কারাগারে থাকা ক্লিফটন জর্জের সাজা ঘোষণা করা হবে আগামী ৯ জুন।