স্বাস্থ্য

এনএইচএসে সংকট গভীরতর: প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার রোগী করিডোরে চিকিৎসা নিতে বাধ্য

15744_e88949d0-6570-11f1-b034-6181319b209d.jpeg

ইংল্যান্ডের হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকটের কারণে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার রোগী করিডোর বা অস্থায়ী চিকিৎসা এলাকায় চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রথমবারের মতো প্রকাশিত সরকারি তথ্য থেকে এই চিত্র উঠে এসেছে, যা দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (এনএইচএস)-এর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের বাস্তবতা সামনে এনেছে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মে মাসে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ২৪১ জন রোগী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে (এঅ্যান্ডই) করিডোর বা অস্থায়ী স্থানে চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়া হাসপাতালের ওয়ার্ডের ভেতরে বা আশপাশে আরও ৬৬৯ জন রোগী একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার ৯১০ জন রোগী করিডোরভিত্তিক চিকিৎসা পেয়েছেন।

এনএইচএসের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো রোগী যদি ৪৫ মিনিটের বেশি সময় করিডোর, সাইড-রুম, অস্থায়ী চিকিৎসা এলাকা কিংবা অন্য কোনো অনুপযুক্ত স্থানে চিকিৎসা গ্রহণ করেন অথবা ওয়ার্ডে শয্যা ছাড়া অবস্থান করতে বাধ্য হন, তাহলে তাকে ‘করিডোর কেয়ার’-এর আওতায় ধরা হয়।

স্বাস্থ্যসেবা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জরুরি বিভাগে করিডোর কেয়ারের অর্ধেকেরও বেশি ঘটনা মাত্র ২০টি ট্রাস্টে ঘটেছে। হাসপাতালের অন্যান্য অংশে সংঘটিত এমন ঘটনার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ঘটেছে আরও ২০টি ট্রাস্টে।

করিডোরে চিকিৎসা পাওয়া রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিজ্ঞতা উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ইস্ট মিডল্যান্ডস অঞ্চলের বাসিন্দা সুজান জানান, চলতি বছরে তিনি তার আশির কোঠায় থাকা মাকে পাঁচবার জরুরি বিভাগে নিয়ে গেছেন। প্রতিবারই তাদের ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় করিডোরে অপেক্ষা করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমার মা যেন ট্রলির সমুদ্রে একটি ট্রলি মাত্র ছিলেন। তিনি বিভ্রান্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা পাশে না থাকলে হয়তো তাকে পানি বা টয়লেটে যাওয়ার সহায়তাও কেউ দিত না।”

পূর্ব ইংল্যান্ডের বাসিন্দা ক্যাথি জানান, চোখের সংক্রমণের সন্দেহে চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে যাওয়ার পর তাকে একা একটি চেয়ারে বসে ৩৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল। পরে চিকিৎসকরা জানান, তার ঝাপসা দেখার কারণ আসলে মস্তিষ্কে টিউমার।

তিনি বলেন, “অভিজ্ঞতাটি ছিল ভয়াবহ। বাড়ি ফিরে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমি ছিলাম সম্পূর্ণ ক্লান্ত ও ভেঙে পড়া।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নার্সও করিডোর কেয়ারের ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন। এক নার্স জানান, এক শিফটে করিডোরজুড়ে রোগীদের সারি ছিল। সেই সময় মৃতদেহ মর্গে নেওয়ার জন্য করিডোর দিয়ে নিয়ে যেতে হয় এবং কিছুক্ষণ পর একই করিডোরে আরেক রোগীর হৃদরোগজনিত জরুরি অবস্থা দেখা দেয়।

তিনি বলেন, “দুর্বল ও অসুস্থ রোগীদের সামনে বুক চাপ দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা চলছিল। এতে কোনো মর্যাদা বা মানবিকতা নেই।”

আরেক নার্স জরুরি বিভাগকে “যুদ্ধক্ষেত্রের মতো” বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এক রোগী করিডোরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, কিন্তু দীর্ঘ সময় কেউ তা বুঝতেই পারেনি।

তার ভাষায়, “এত দীর্ঘ সময় তিনি মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন যে শরীর শক্ত হতে শুরু করেছিল। কেউ খেয়ালই করেনি। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে যে কারও প্রিয় মানুষ এভাবে একা মারা গেছেন।”

যুক্তরাজ্য সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে করিডোর কেয়ার পুরোপুরি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জেমস মারে বলেন, “করিডোরে চিকিৎসা দেওয়া অগ্রহণযোগ্য, অমানবিক এবং এনএইচএসে এর কোনো স্থান নেই। সমস্যার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে আমরা প্রথমবারের মতো এই তথ্য প্রকাশ করছি।”

এদিকে এনএইচএস ইংল্যান্ড জানিয়েছে, মে মাস সাধারণত হাসপাতালের ওপর সর্বোচ্চ চাপের সময় না হলেও সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের কারণে রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল।

রয়্যাল কলেজ অব নার্সিংয়ের মহাসচিব অধ্যাপক নিকোলা রেঞ্জার প্রকাশিত পরিসংখ্যানকে “উদ্বেগজনক” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এই সংখ্যাগুলোর পেছনে শুধু রোগী ও তাদের পরিবারের দুর্ভোগই নয়, প্রতিদিন নিম্নমানের সেবা দিতে বাধ্য হওয়া হতাশ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নার্সদের কষ্টও লুকিয়ে আছে।”

স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য কিংস ফান্ডের বিশ্লেষক সিভা আনন্দাসিভা বলেন, “এই তথ্যগুলো এমন একটি বাস্তবতার প্রমাণ, যা কখনোই এনএইচএসের স্বাভাবিক চিত্র হয়ে ওঠা উচিত ছিল না।”

তিনি আরও বলেন, “তথ্যগুলো জনসমক্ষে আসা ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও শুধুমাত্র পরিসংখ্যান প্রকাশ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘ অপেক্ষা ও শয্যা সংকটের তথ্য বহু বছর ধরেই প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি এখনো দেখা যায়নি।”

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও