
তারেক রহমান ব্যর্থ হলে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যর্থ হবে: ব্যারিস্টার মাহাবুব
নতুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনেক আশা নিয়ে জাতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেছে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসন ও লুটপাটে জীর্ণ অর্থনীতি। শিক্ষা-সংস্কৃতি নিম্নমুখি। সবখানেই হাহাকার। রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সরকারের সব কাঠামোতেই অবিশ্বাসে ভরপুর। ফ্যাসিবাদের দোসর ও গুপ্ত-সুপ্ত কিংবা লুটপাটে প্রশাসন বিপর্যস্ত। প্রধানমন্ত্রীর অফিস, সচিবালয় থেকে শুরু করে উপজেলা প্রশাসনে মানুষের আস্থা ফেরানোর সবচেষ্টায়-ই কোনো কোনো মহল থেকে তুমুল সমালোচনার সূত্রপাত হয়।
মোদ্দাকথা হলো - তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এমন এক সময় সরকার গঠন করেছে, যখন দেশের সবকিছুই যেন এলোমেলো। ফ্যাসিবাদ শক্তি রাষ্ট্র কাঠামোকে দূর্বল করে দিয়ে গেছে। শৃঙ্খলা বা জনআস্থা ফেরানোর সব চেষ্টায়-ই যেন সফল হওয়া অসম্ভব প্রায়। এরপর ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ক্লান্তি ও রাষ্ট্র পরিচালনার অনভিজ্ঞতার বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য।
এমন একটি পরিস্থিতিতে মূলত: বাংলাদেশের মানুষ আস্থা রেখেছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরী তারেক রহমানের ওপর। প্রশ্ন উঠতে পারে - শুধুমাত্র দুই রাষ্ট্রনায়কের সন্তান হওয়ার কারনেই কী তারেক রহমানের ওপর মানুষ আস্থা রেখেছে গত ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনে। এক কথায় এর উত্তর দেয়া যাবে না। তবে 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ' দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা ও ধারকের সন্তান হিসেবে তারেক রহমান নিজেকে তাদের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন - বলেই তিনি আজকে প্রধানমন্ত্রী। সহজভাবে বলতে গেলে তৃণমূল থেকে রাজনীতিতে যোগদান, তৃণমূলের রাজনীতিকে ঢেলে সাজানো, জুলুম - নিপীড়নের শিকার হওয়া এবং দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির আন্দোলনে সফল নেতৃত্ব প্রদানের কারনেই তারেক রহমানের ওপর বাংলাদেশের মানুষ আস্থা রেখেছে।
এবার লেখার শিরোণামে আসি। রোববার, ৫ জুলাই ২০২৬ বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীপরিষদ থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি সকল কাজের ব্যানার-ফেস্টুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞাটি মূলত: তারেক রহমান নিজেই জরুরী ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিয়ে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। ঘটনাটি এরকমের - প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুলশানের বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে চলছেন, তখন তিনি দেখতে পান বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুন - পোস্টারে সরকারি প্রকল্পের শ্লোগান লেখা এবং বড় করে প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেওয়া। প্রচারণার বিষয়ের চেয়ে তাঁর ছবিগুলো বড় করে ছাপা হয়েছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রী পরিষদের সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর ছবির বদলে প্রচারণার বিষয়কে বড় করে লেখার নির্দেশনা দিলেন।' (প্রজ্ঞাপনটি সংযুক্ত করা হলো।)
প্রশ্ন হলো - প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞার পেছনের কারণ কী? এর মাধ্যমে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিকে বা সরকারের সকল কর্তা ব্যাক্তিদের কী বুঝাতে চেয়েছেন। প্রাসঙ্গিকভাবে এ বিষয়ে আলোকপাতের আগে আমি ২০১৫ সালে গণমাধ্যমে প্রকাশিত আমার একটি লেখার রেফারেন্স দিতে চাই। 'তারেক রহমান কী রাষ্ট্রনায়ক হতে পারবেন?' এই শিরোণামের লেখাটি পরবর্তীতে আমার লেখা বই 'তারেক রহমান ও বাংলাদেশ'-এ ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়। বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়েছিল লন্ডনের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল)-এ। যেখানে তারেক রহমান এবং তাঁর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। ওই বই প্রকাশের পর শুধুমাত্র এই একটি আর্টিকেলের শিরোণাম নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কেন তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো - এমন সমালোচনা করেছিলেন কেউ কেউ। মূলত: আর্টিকেলটি না পড়েই শুধু শিরোণাম দেখেই তারা ভূল মতামত দিয়েছিলেন। যাই হোক - মূলত: ওই আর্টিকেলে তুলে ধরা বিষয়গুলোর ভবিষ্যত পদক্ষেপ হিসেবেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘এই ছবি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাসহ নানাবিধ জনমুখি’ উদ্যোগ নিচ্ছেন।
ওই আর্টিকেলে মহামনীষী অ্যারিস্টটলের একটি উক্তি রেফার করা হয়েছিল। যেখানে অ্যারিস্টটল বলেন, ''রাষ্ট্রনায়ক তার সহনাগরিকদের (সহকর্মী) নির্দিষ্ট নৈতিক চরিত্র বিকাশে উদ্বিগ্ন থাকেন, বিশেষ করে উন্নত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কর্মের গুন ও কর্মক্ষমতার বিন্যাস ঘটাতে।''
প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশৃঙ্খলার সোজাসাপ্টা কোনো সমাধান নেই। এখানে সমাজে মৌলিক মানবিক গুন সম্বলিত মানুষ (নাগরিক ও নেতৃত্ব) গড়ে তোলা জরুরী। আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মূলত: সবার জন্য খাবার মেনুতে কৃচ্ছতা সাধন, সংসদ সদস্যদের সরকারি প্লট ও গাড়ি না নেওয়া, পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুনে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে সমন্বিত উদ্যোগে দেশগঠনের আহ্বান জানানোর মতো অগণিত পদক্ষেপ এমন টার্গেট নিয়েই বাস্তবায়ন করছেন - যাতে সমাজে মানুষের মানসিক একটি পরিবর্তন ঘটে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো - আমাদের দেশের স্টেকহোল্ডাররা এসব সিদ্ধান্ত অনুসরণ করার জন্য প্রস্তুত কি-না? অথবা, অন্যভাবে বললে সরকারের প্রশাসন ববস্থা, রাজনৈতিক দল (সরকারি দলসহ সব রাজনৈতিক দল) এবং সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক মানসিকতাকে ধারণ করতে পারছে কি-না? প্রথমত: প্রশাসনব্যবস্থা বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দলীয়করণের কারণে ভঙ্গুর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রশাসনিক কাঠামোকে পুননির্মাণ অত্যন্ত দূরুহ কাজ। নানা সীমাবদ্ধতা থাকার পরও সরকারের নির্বাহী ও বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানোর জন্য নানামুখি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু, বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোয় ইতিবাচক ইনটেনশনকে কিছুটা দূর্বলতা বলেই গণ্য করা হয়। যেহেতু, ফ্যাসিবাদের দোসর বাদ দিলে প্রশাসনব্যবস্থা পরিচালনা করার মতো লোকবল থাকবে না, সেহেতু অপেক্ষাকৃত দক্ষদের (ফ্যাসিবাদের অপেক্ষাকৃত ছোট দোসর) দিয়ে প্রশাসন ব্যবস্থা চালানোর চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু, এমন সফট্ আচরণকে দূর্বলতা ভেবে আবার নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নানাভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। একইভাবে, এমন উদ্যোগে সরকারকে সহযোগিতা প্রদানে বিরোধীদল জামায়াত ও এনসিপির কোনো দায়িত্বশীল ভূমিকা দেখা যায় না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন বিদ্যমান ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা সরকারি দল বিএনপির কার্যক্রমে। স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া এবং সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের যথেষ্ট অভাব দৃশ্যমান হওয়ায় দল হিসেবে বিএনপিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গৃহীত জনমুখি পদক্ষেপগুলো নিয়ে জনগণের দুয়ারে যাওয়ার সংবাদ মিডিয়ায় দৃশ্যমান নেই। সোস্যাল মিডিয়ায় সরকারি দলের নেতাকর্মীদের না পাওয়ার বেদনা ও দীর্ঘশ্বাস স্পষ্ট। এই জায়গা থেকে দল হিসেবে বিএনপিকে আরো সুসংগঠিত কর্মসূচি গ্রহণ জরুরী। অন্যদিকে, বিএনপির তৃণমূলকে মনে রাখতে হবে, ২০ বছর পর বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে - এমন এক সময়ে যখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ভঙ্গুর দশায় নিমজ্জিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আপনাদের সময় দিতে হবে। তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার পাশাপাশি তাঁর গৃহীত ইতিবাচক কাজগুলোকে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।
খুবই লক্ষণীয় যে, সোস্যাল মিডিয়ায় এখন বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি এবং নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের প্রতাপ বিরাজমান। এমন সময় অভিমান না করে স্থানীয় নেতৃবন্দ এবং সংসদ সদস্যদের জবাবদিহিতার মধ্যে এনে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশে দাড়ানো জরুরী। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হচ্ছে – এ সময় তারেক রহমান ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যর্থ হবে। বিশিষ্ট রাষ্ট্র দার্শনিক জাতীয় অধ্যাপক ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান এক-এগারো সরকারের পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাতকারে আমাকে বলেছিলেন, ''বাংলাদেশী রাষ্ট্র রক্ষার জন্য জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শন রক্ষা করা জরুরী। আর এজন্যই তারেক রহমানকে আমাদের সেভ করতে হবে।'' আমি বলবো, আজকের বাংলাদেশ রাষ্ট্র রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে সফল হতে হবে। তারেক রহমান ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যর্থ হবে।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে - কোন পথে তারেক রহমান সফল হতে পারেন? কত বছর ক্ষমতায় থাকলে তিনি সফল হবেন? মূলত: ক্ষমতায় স্থায়ীত্ব দিয়ে সফলতা বিচার করা যায় না। চলমান ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে তারেক রহমান সফল হতে পারেন। আর এজন্য দরকার একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব। একটি মৌলিক সামাজিক বিপ্লবের লক্ষ্য নিয়েই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিহিংসার রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে বাতিল ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর পদকে 'ক্ষমতা' না ভেবে তিনি 'রেসপন্সিবিলিটি' হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ঈদের ছুটিতে নিজে গিয়ে সিটিকর্পোরেশনের ময়লা পরিস্কার কার্যক্রম তদারকি করেন। প্রোটোকলের গাড়িবহর কমিয়ে ও ট্রাফিক আইন মেনে সড়কে চলছেন গণমানুষের সারিতে। এমনভাবে মানুষের নৈতিক ও মানবিক পরিবর্তন করতে চান তারেক রহমান। ১৭ বছর তিনি যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে ছিলেন। উন্নত বিশ্বের নাগরিকদের নৈতিক মান ও নেতৃত্বের মানবিক গুনাবলী তিনি অবলোকন করেছেন। এজন্যই উন্নত মানসিকতার একটি জাতি গড়ে তুলতে তিনি দিন-রাত ছুটে চলছেন।
আবার অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাড়াতে তারেক রহমান নিজস্ব উতপাদন ব্যবস্থা ও শিল্প কলকারখানায় সরকারি প্রণোদনার উদ্যোগ নিয়েছেন। 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতিতে উন্নয়ন সহযোগিতার আহ্বান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সফর করেছেন মালয়েশিয়া ও চীন। এই দু'দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিপ্লবের প্রভাব কিভাবে আমাদের অর্থনীতিতে নিশ্চিত করা যায় - তা নিয়ে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও চীনের রাষ্ট্রপতি সহ শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে বেশকিছু চুক্তি করেছেন। উল্লেখ করা জরুরী যে, চীন, ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রমুখিতা নয়; সবার সাথেই কাজ করার আগ্রহ নিয়ে 'সবার আগে বাংলাদেশের' স্বার্থ নিশ্চিত করতে ছুটে চলবেন তারেক রহমান, এমনই পরিকল্পনা তাঁর। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পুর্ণ করতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নচারী প্রতিটি নাগরিককে প্রধানমন্ত্রী মি. রহমানের পাশে থাকা জরুরী। আসুন, আমরা তারেক রহমানের ভাল কাজের ব্রান্ডিং করি। নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তাঁর সহযাত্রী হই।
লেখক:
ব্যারিস্টার মাহাবুবুর রহমান
যুক্তরাজ্যের সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী ও রয়টার্সের সাবেক সংবাদিক