আন্তর্জাতিক

অং সান সু চি মারা গেছেন?

16044_IMG_7696.jpeg

মিয়ানমারের ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী অং সান সু চি জীবিত আছেন কি না, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২২ সালের শেষ দিকে তার বিচার শেষ হওয়ার পর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এমনকি তার আইনজীবী, পরিবারের সদস্য বা বিদেশি কূটনীতিকদের কাউকেই তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।

৮১ বছর বয়সী সু চির ছেলে কিম অ্যারিস সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে সফর করে বিশ্বনেতাদের কাছে তার মায়ের ‘প্রুফ অব লাইফ’ বা জীবিত থাকার প্রমাণ দাবি করার আহ্বান জানিয়েছেন। লন্ডনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রায় চার বছর ধরে তার পরিবারের কেউ সু চির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, তার মা এখন কোথায় আছেন এবং তিনি আদৌ জীবিত আছেন কি না।

মিয়ানমারের সামরিক সরকার গত এপ্রিল মাসে দাবি করেছিল, সু চিকে কারাগার থেকে গৃহবন্দি অবস্থায় নেওয়া হয়েছে। তবে এরপরও তাকে দেখতে চাওয়া বিদেশি কূটনীতিকদের অনুরোধ বারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সরকার শুধু বলছে, তিনি সুস্থ আছেন। কিন্তু তার অবস্থান, স্বাস্থ্য বা বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।

এপ্রিলে সামরিক সরকার সু চির একটি ছবি প্রকাশ করে। ছবিতে তাকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা ও সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। তবে ছবিটি কবে তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। কিম অ্যারিস ছবিটির সত্যতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, যদি সত্যিই তার মা গৃহবন্দি থাকেন, তাহলে সেটি ইয়াঙ্গুনের পারিবারিক বাড়িতে নয়। কারণ রাজধানী নেপিডোতে তার সরকারি বাসভবন ইতোমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে।

মার্চে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়া সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের কাছে সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ সু চির বিষয়ে জানতে চান। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সু চির নাম উঠতেই মিন অং হ্লাইং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান।

এতে কিছু কূটনীতিকের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, সামরিক সরকার হয়তো সু চির জীবিত থাকার প্রমাণ দেখাতে পারছে না। তবে লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ মরগান মাইকেলস মনে করেন, সু চি মারা গেলে বা গুরুতর অসুস্থ হলে সেটি এতদিন গোপন রাখা সামরিক সরকারের পক্ষে খুবই কঠিন হতো। তার মতে, সেনাপ্রধানের ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিদ্বেষই সু চিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখার প্রধান কারণ হতে পারে।

এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও সম্প্রতি মিয়ানমারের জান্তা সরকারের কাছে সু চির অবস্থার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। গত ১২ জুলাই ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও বিষয়টি উত্থাপিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, অন্তত বিদেশি কূটনীতিকদের তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিলে আসিয়ান ও জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে। কারণ ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারকে আসিয়ানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে কার্যত দূরে রাখা হয়েছে।

তবে সু চিকে মুক্তি দিলে দেশের ভেতরে পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। এক বিদেশি কূটনীতিকের মতে, সু চি মুক্তি পেলে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বর্তমান ঐক্যে ভাঙন ধরতে পারে।

অন্যদিকে মরগান মাইকেলস মনে করেন, মিয়ানমারের সামরিক সরকার সশস্ত্র প্রতিরোধের চেয়ে সু চির নেতৃত্বে আবারও কোনো শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন শুরু হওয়ার আশঙ্কাকেই বেশি ভয় পায়। তার মতে, দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকলেও মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ বামার জনগোষ্ঠীর কাছে সু চির জনপ্রিয়তা এখনো অনেক বেশি, আর সেটিই জান্তা সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি) জানিয়েছে, বর্তমানে মিয়ানমারের কারাগারে ১৪ হাজার ৫০০-এর বেশি রাজনৈতিক বন্দী রয়েছেন। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরই কারাগারে অন্তত ৬০ জন রাজনৈতিক বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। কারাগারগুলোতে চিকিৎসা ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধারও মারাত্মক সংকট রয়েছে।

কিম অ্যারিস বলেন, তিনি শুধু নিজের মায়ের খবর জানতে চান না; তার মা নিজেও চাইতেন, মিয়ানমারের অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দির দুর্দশার কথাও যেন বিশ্ব ভুলে না যায়।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও