
লন্ডনের গণপরিবহন সংস্থা ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল)-এর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় ভয়াবহ সাইবার হামলার ঘটনায় দুই তরুণ হ্যাকারকে সাড়ে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের একটি আদালত। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন পূর্ব লন্ডনের বো এলাকার বাসিন্দা ২০ বছর বয়সী থালহা জুবাইর এবং ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ওয়ালসালের ১৯ বছর বয়সী ওউইন ফ্লাওয়ার্স।
বৃহস্পতিবার উলউইচ ক্রাউন কোর্ট রায় ঘোষণা করেন। টিএফএলের সিস্টেমে হামলার দায়ে থালহা জুবাইরকে সাড়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় ওউইন ফ্লাওয়ার্সও সাড়ে পাঁচ বছরের সাজা পান। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের দুটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলার দায়েও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
আদালতে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চালানো এই হামলায় অভিযুক্তরা টিএফএলের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক (ডোমেইন অ্যাডমিন) প্রবেশাধিকার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা এমন অবস্থানে পৌঁছেছিল যেখান থেকে চাইলে পুরো টিএফএলের নেটওয়ার্ক অচল করে দিতে পারত। তদন্তকারীরা এই প্রবেশাধিকারকে ‘কিংডমের চাবি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
টিএফএল জানিয়েছে, হামলাটি তাদের প্রযুক্তি অবকাঠামোর জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করেছিল এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য পরিবহন সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত নিজেদের সিস্টেম আংশিকভাবে বন্ধ করে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
এই সাইবার হামলার ফলে টিএফএলের প্রায় ৩৯ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৯ মিলিয়ন পাউন্ড তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং ১০ মিলিয়ন পাউন্ড আয় হারানোর কারণে হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৭০ লাখ গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়েছে এবং ২৭ হাজার টিএফএল কর্মীকে তাদের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করতে হয়েছে।
যদিও লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড ও বাস চলাচল সরাসরি বন্ধ হয়নি, তবে প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য পরিচালিত ‘ডায়াল-এ-রাইড’ সেবার বুকিং সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে টিএফএল গো অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে লাইভ ট্রেন আগমনের তথ্য দেখানো বন্ধ হয়ে যায় এবং অয়েস্টার ও কনট্যাক্টলেস পেমেন্ট-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা বিঘ্নিত হয়।
আদালতে আরও জানানো হয়, হামলার সময় অভিযুক্তরা টিএফএলের গ্রাহক ডেটাবেসে প্রবেশ করে বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তির তথ্যও খুঁজে দেখেছিল।
তদন্তে জানা গেছে, টিএফএলের হেল্পডেস্কে এক সহযোগী নিজেকে প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিচয় দিয়ে ফোন করেন এবং দূর থেকে লগইন করতে সমস্যার কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে নিরাপত্তা যাচাইকরণ পদ্ধতি পরিবর্তন করিয়ে নেন। এরপর থালহা জুবাইর ও ওউইন ফ্লাওয়ার্স সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে সিস্টেমের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।
তদন্তকারীদের মতে, দুই তরুণই ইংরেজিভাষী হ্যাকারদের কুখ্যাত নেটওয়ার্ক ‘স্ক্যাটার্ড স্পাইডার’-এর সক্রিয় সদস্য ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত একাধিক বড় সাইবার হামলার সঙ্গে এই গোষ্ঠীর নাম জড়িয়েছে। হামলার সময় তারা টেলিগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ করছিল এবং একপর্যায়ে ফ্লাওয়ার্স পুরো হামলার ভিডিওও ধারণ করেন।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, থালহা জুবাইর অল্প বয়স থেকেই কম্পিউটার ও প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষ হয়ে ওঠেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি হ্যাকিংয়ে জড়িয়ে পড়েন। এর আগে কিশোর বয়সে প্রতারণা, অননুমোদিত কম্পিউটার প্রবেশ, ব্ল্যাকমেইল, পুলিশ সার্ভার হ্যাক এবং দুই তরুণীকে অনুসরণ ও হয়রানিসহ মোট ২২টি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।
অন্যদিকে, ওউইন ফ্লাওয়ার্সও আগে থেকেই পুলিশের নজরদারিতে ছিলেন। ২০২৩ সালে ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস পুলিশ তাকে সাইবার অপরাধ থেকে বিরত রাখতে প্রশিক্ষণের সুযোগ দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
আদালতে উভয় অভিযুক্তের আইনজীবীরা জানান, থালহা জুবাইর ও ওউইন ফ্লাওয়ার্স দুজনই অটিজমে আক্রান্ত। থালহার বিষণ্নতা ও গুরুতর মানসিক সমস্যাও রয়েছে। তাদের শৈশবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নানা ধরনের মানসিক চ্যালেঞ্জের কথাও আদালতে তুলে ধরা হয়। তবে বিচারক বলেন, এসব বিষয় অপরাধের ভয়াবহতা কমিয়ে দেয় না।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, থালহা জুবাইরের বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট দিয়ে প্রায় ২০ কোটি মার্কিন ডলারের লেনদেন হয়েছে এবং গ্রেপ্তারের আগে তার একটি ওয়ালেট থেকে প্রায় এক কোটি মার্কিন ডলার স্থানান্তর করা হয়। অন্যদিকে, কোনো বৈধ আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও ওউইন ফ্লাওয়ার্সের নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৭১ লাখ মার্কিন ডলারের সম্পদ ছিল।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)-র ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম ইউনিটের প্রধান পল ফস্টার বলেন, এই মামলার রায়ের ফলে ‘স্ক্যাটার্ড স্পাইডার’ গোষ্ঠীর কার্যক্রম বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে এবং তাদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, হামলার সময় টেলিগ্রামে এক পর্যায়ে ওউইন ফ্লাওয়ার্স থালহা জুবাইরকে লিখেছিলেন, “জেলে বসে তখন আর হাসতে পারবে না।” শেষ পর্যন্ত সেই কথাই বাস্তবে পরিণত হলো।