
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম।
যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা ঘোষণার এক মাস পর এই তদন্ত শুরু হলো। অফকম মূলত পরীক্ষা করবে, টিকটক কীভাবে ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাই করে এবং শিশুদের ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে সুরক্ষিত রাখতে তাদের ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর।
টিকটকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা অনলাইন সেফটি অ্যাক্টের (OSA) নিয়ম মেনে চলতে আত্মবিশ্বাসী এবং তদন্তে অফকমকে সহযোগিতা করবে। তিনি বলেন, শিশুদের জন্য নিরাপদ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে টিকটক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শভিত্তিক নীতিমালা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
তবে অফকমের পক্ষ থেকে টিকটকের বয়স যাচাই পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটির স্ট্র্যাটেজি ও রিসার্চ বিভাগের পরিচালক কেট ডেভিস বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ব্যবহৃত কিছু বয়স যাচাই পদ্ধতি যথেষ্ট কার্যকর নয় বলে তারা দেখতে পেয়েছেন।
তদন্তের মূল বিষয়গুলোর একটি হলো টিকটকের ‘এজ ইনফারেন্স’ প্রযুক্তির ব্যবহার। এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর বয়স অনুমান করে তার অনলাইন আচরণের ভিত্তিতে—যেমন তিনি কী ধরনের ভিডিও দেখছেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বা কীভাবে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন।
অফকম জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি “অত্যন্ত কার্যকর” কি না, তা নিয়ে তাদের গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে শিশুদের বয়স নিশ্চিত করা যায় এবং তারা ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে সুরক্ষিত থাকে।
টিকটক অবশ্য দাবি করেছে, বয়স উপযোগী অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং যুক্তরাজ্যে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে অনলাইন নিরাপত্তায় কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করেছে।
টিকটকের বিরুদ্ধে এই তদন্ত বৃহত্তর একটি উদ্যোগের অংশ, যেখানে শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক ও ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে রক্ষা করতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। গত বছরের ২৫ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট অনুযায়ী, যেসব ওয়েবসাইটে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাইয়ের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এর আগে বয়স যাচাইয়ে ব্যর্থতার অভিযোগে বেশ কয়েকটি প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে অফকম এবং জরিমানাও করেছে।
টিকটক ছাড়াও ইনস্টাগ্রামের মতো অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বয়স অনুমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ইনস্টাগ্রাম জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের ব্যবহারকারীদের ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য নির্ধারিত নিরাপদ অভিজ্ঞতায় রাখা হয়, যতক্ষণ না তাদের প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে নিশ্চিত করা যায়।
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংস্থা মলি রাসেল ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি বারোজ অফকমের তদন্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শিশুদের ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে রক্ষা করতে টিকটক বড় ধরনের ব্যর্থতা দেখিয়েছে।
মলি রাসেল নামের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহানি ও আত্মহত্যাসংক্রান্ত কনটেন্ট দেখার পর আত্মহত্যা করেছিল। তার পরিবারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত মলি রাসেল ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে অনেক কিশোর-কিশোরী টিকটকে ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে।
অনলাইন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রেবেকা স্মার্ট বলেন, শিশু সুরক্ষায় অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট কিছু অগ্রগতি এনেছে, তবে নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। তার মতে, শক্তিশালী জবাবদিহি ও কঠোর শাস্তি ছাড়া শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি পুরোপুরি কমানো সম্ভব হবে না।