
মিয়ানমারের রাখাইন থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করা দুটি নৌকায় থাকা আনুমানিক ৫৩০ রোহিঙ্গা তিন সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ। ধারণা করা হচ্ছে, বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরে নৌকা দুটি ডুবে গেছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলে একজন নারীর মরদেহ এবং মিয়ানমারের উপকূলে আরও কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার হলেও অধিকাংশ যাত্রীর ভাগ্য অজানাই রয়ে গেছে। মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা নৌ-দুর্ঘটনাগুলোর একটি হতে পারে।
গত ২৯ জুন মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে রোহিঙ্গাবাহী নৌকা দুটি। সাগরে নামার পরই তাদের গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়টি মানবাধিকারকর্মীদের বেশ কৌতুহলী করছে। কেন, কী কারণে তাদের পাওয়া যাচ্ছে না; এর পেছনে তারা একটি তত্ত্বই দাঁড় করাচ্ছেন- বর্ষাকালের উত্তাল সাগরে দুটি নৌকাই ডুবে গেছে এবং সেগুলোয় হাতেগোনা কজনই জীবিত থাকতে পারেন।
রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ‘আরাকান প্রজেক্টের’ পরিচালক ক্রিস লেওয়া বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, ২৯ জুন রাখাইনের সিন টেট মাও এলাকা থেকে যাত্রা করেছিল রোহিঙ্গাবাহী নৌকাদুটি। একটি সকালে এবং অন্যটি পরে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নৌকাগুলো মিয়ানমারের দক্ষিণ উপকূলে পৌঁছানোর পর যাত্রীদের নামিয়ে স্থলপথে থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় নেওয়ার কথা ছিল। সাধারণত এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের কাছ থেকে খবর পেয়ে থাকে। কিন্তু প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনো যোগাযোগ হয়নি।
এদিকে বাংলাদেশের উপকূলে এক নারীর মরদেহ ভেসে এসেছে। পাশাপাশি ইরাবতী বদ্বীপ ও মোন রাজ্যের মধ্যবর্তী সাগর এলাকায় জেলেরা আরও কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার করেছেন। এসব ঘটনার ভিত্তিতে ক্রিস লেওয়ার ধারণা, একটি নৌকা যাত্রার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এবং অন্যটি কয়েক দিন পর সাগরে ডুবে যায়।
রাখাইন রাজ্য বহু বছর ধরে সংঘাতের কেন্দ্র। বিদ্রোহী আরাকান আর্মি রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা দখলে নিয়েছে এবং রাজধানী সিত্তেকে ঘিরে রেখেছে। সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন।
বর্তমানে রাখাইনে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাস্তুচ্যুত মানুষের (আইডিপি) শিবিরে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। বাকিরাও যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
একদিকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিচ্ছে, অন্যদিকে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধেও রোহিঙ্গাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকের কাছেই দেশ ছেড়ে পালানোই একমাত্র পথ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের কক্সবাজারের শিবিরগুলোয় বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই বললেই চলে। অপরাধী চক্রের তৎপরতাও বেড়েছে। এসব কারণে অনেক রোহিঙ্গা দালালচক্রের মাধ্যমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
মালয়েশিয়ায় ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করায় দেশটি এখনও তাদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
পাচারকারীরা পুরোনো মাছ ধরার ট্রলারে যত বেশি সম্ভব মানুষ তোলেন। এরপর থাইল্যান্ড বা মিয়ানমারের দক্ষিণ উপকূলে নামিয়ে স্থলপথে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়। প্রতিজনের কাছ থেকে প্রায় তিন হাজার মার্কিন ডলার আদায় করা হয়।
যেসব পরিবারের পক্ষে পুরো অর্থ দেওয়া সম্ভব হয় না, তাদের স্বজনদের আটক রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে।
২০১৫ সালে থাইল্যান্ড মানবপাচারবিরোধী অভিযান জোরদার করার পর পাচারকারীদের পুরোনো রুটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সে সময় থাইল্যান্ডে গণকবর আবিষ্কারের পর আন্তর্জাতিক চাপও বেড়ে যায়।
বর্তমানে বড় নৌযান রাখাইন বা বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূল থেকে রোহিঙ্গাদের তুলে নিয়ে গভীর সাগরে অবস্থান করে। এরপর ছোট নৌকায় তাদের থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেখান থেকে গোপনে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়।
তবে রাখাইন থেকে স্থলপথ প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের পালানোর শুরুটা এখনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার ওপরই নির্ভর করছে।
ক্রিস লেওয়ার হিসাবে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে পালানোর চেষ্টা করেছেন। আগের বছরগুলোর তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ আশ্রয়ের পথ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশই নতুন করে রোহিঙ্গাদের গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে সমুদ্রপথে জীবন বাজি রেখে পালানোর প্রবণতা আরও বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।