
ফুটবল বিশ্বকাপকে ‘ট্রাম্পীয় নাট্যমঞ্চে’ রূপ দেওয়ার বিনিময়ে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আয়ের আশা করছে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
অস্ট্রেলিয়াকে কষ্টার্জিত ব্যবধানে হারিয়ে শুক্রবার (১০ জুলাই) দ্বিতীয় আরব দেশ হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ১৬-তে জায়গা করে নেয় মিসর। গায়ে ফিলিস্তিনের পতাকা জড়িয়ে মিসরের কোচ হোসাম হাসান তার দলের এই জয় গাজাবাসীর উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে বসে গাজার বহু মানুষ এই ম্যাচ সরাসরি দেখছিলেন।
উরুগুয়ের লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানোর কাছে ফুটবল ছিল ‘সবকিছুর দর্পণ’। তার মতে, এই সুন্দর খেলাটি সবসময় সেই পৃথিবীর চরিত্রকে প্রতিফলিত করে, যেখানে এটি খেলা হচ্ছে। এর আলো আর অন্ধকার দুই দিকই তাতে ফুটে ওঠে।
এবারের বিশ্বকাপও এর ব্যতিক্রম নয়। টুর্নামেন্টটি একদিকে যেমন নতুন করে জেগে ওঠা সাম্রাজ্যবাদী বর্বরতাকে বৈধতা দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি যৌথ আনন্দের মাধ্যমে আমাদের অভিন্ন মানবিকতাকে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ডালাস স্টেডিয়ামে মিসরের অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহর নেওয়া পেনাল্টি কিকে আনন্দের মেতে উঠেছিলেন ফিলিস্তিনের মানুষ। কিন্তু এর মাত্র কয়েক দিন আগে এক ট্র্যাজেডি ঘটে যায়। ফিলিস্তিনের ৩২ বছর বয়সি গোলরক্ষক সেলিম আল-আশকারকে গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলি বাহিনী। তিনি তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর জন্য রান্নার জ্বালানি খুঁজতে বের হয়েছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হামলায় ফিলিস্তিনের ক্রীড়াঙ্গনের যে ৫৬৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, সেলিম আল-আশকার তাদেরই একজন।
এই প্রতিযোগিতাটি আসলে এমন এক বৈশ্বিক ব্যবস্থার জুতসই রূপক, যা নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালায়, সম্পদ লুট করে এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা দক্ষিণের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেয়। ইসরায়েলের এই অপরাধগুলোর জন্য ফিফা এখনও ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। তবে এসব নৃশংসতা ফিলিস্তিনিদের মনোবল দমাতে পারেনি।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মিসরের ম্যাচটি দেখতে গাজা সিটিতে জড়ো হয়েছিলেন বহু মানুষ। ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজার ৯০ শতাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ভেঙে পড়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। তাই খেলা দেখানোর জন্য ছোট ছোট বিদ্যুৎ জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। গুঁড়ো হয়ে যাওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শিশুরা পতাকা ওড়াচ্ছিল। যে মাটিতে একসময় ঘরবাড়ি ছিল, সেই মাটিতে দাঁড়িয়েই সমর্থকেরা ইয়াসির ইব্রাহিমের প্রথম গোলের পর উল্লাসে মেতে ওঠেন।
উপনিবেশবাদী বর্ণবাদ
কিন্তু গাজাবাসীর এইটুকু আনন্দ ও স্বস্তিও দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর সহ্য হয়নি। ম্যাচ শুরুর এক ঘণ্টা আগে খেলা দেখার জন্য যাওয়ার পথে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন মোহাম্মদ আল-ওয়াহিদি। এই ত্রাণকর্মী গাজা সিটিতে সরাসরি খেলা সম্প্রচারের ব্যবস্থা করেছিলেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিশ্বকাপের এই সময়টাকে বেছে নিয়েছেন ফিলিস্তিনি ফুটবলের ওপর আক্রমণ আরও জোরালো করতে। তবে ফিফা একে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে সফল আয়োজন’ হিসেবে প্রচার করতে ব্যস্ত। তারা এই রক্তপাত দিয়ে উৎসবের আবহ নষ্ট করতে দিতে রাজি নয়।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর দাবি করা এই ‘সুন্দর’ টুর্নামেন্টে শীর্ষ পর্যায়ের রেফারিদের আটক ও বহিষ্কার করা হয়েছে। খেলোয়াড়দের ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এমনকি ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানকে মার্কিন ভিসা পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। ইসরায়েলের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতি ফিফা যে দায়মুক্তি দিয়েছে, তারই সুযোগ নিয়ে এসব কাণ্ড ঘটছে।
ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি তাদের এই সদস্য দেশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা এক অর্থে উপনিবেশবাদী বর্ণবাদের পুনরুত্থানকেই ছাড়পত্র দিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন কর্তৃপক্ষ সমর্থক, কোচ ও অ্যাথলেটদের ওপর এই বর্ণবাদী আচরণ চালিয়েছে।
এটি স্রেফ ‘স্পোর্টসওয়াশিং’ বা খেলার মাধ্যমে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা নয়। এটি আসলে পুরো বিশ্বের চোখের সামনে ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানানো।
ইনফান্তিনো একসময় জোর দিয়ে বলতেন, ‘ফুটবলকে রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত’। অথচ তিনি এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে ফিফাকে দাঁড় করিয়েছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রধান আয়োজক দেশকে খুশি করতে যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত ফিফা। এমনকি মাঠের ভেতরের সিদ্ধান্তেও তারা ছাড় দিচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রথম ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ দিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। শোনা যাচ্ছে, ট্রাম্পের মাত্র একটি ফোনের পরেই মার্কিন স্ট্রাইকার ও দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় ফুটবল কর্তৃপক্ষ।
অনেকে এই সিদ্ধান্তের নোংরা রাজনীতি নিয়ে কথা বলছেন। তবে এমন আলোচনা এটাই প্রমাণ করে যে ফিফার মধ্যে এখনও কিছুটা ক্রীড়াসুলভ মনোভাব অবশিষ্ট আছে বলে লোকে মনে করে। কিন্তু ইরানের জাতীয় দলের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে বেস ক্যাম্প করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এমন বৈষম্যের শিকার ইরান একাই নয়। নিজেদের প্রথম ম্যাচের ঠিক আগের দিন হাইতির জাতীয় দলকে তাদের জার্সি পরিবর্তনের নির্দেশ দেয় ফিফা। জার্সিতে থাকা বিশ্বের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লবের স্মারকটি সরিয়ে ফেলতে বলা হয়। ফিফার যুক্তি ছিল, সেখানে ‘রাজনৈতিক বার্তা’ রয়েছে।
শেষ ১৬-এর পর আর কোনো ম্যাচ আয়োজন করতে পারছে না মেক্সিকো। টুর্নামেন্ট কর্তৃপক্ষের এই নির্লজ্জ আচরণের সঙ্গে মেক্সিকোও বেশ পরিচিত। সেই সঙ্গে টিকেটের লাগামহীন দামের (ডাইনামিক প্রাইসিং) কারণে লাখ লাখ ভক্তের মাঠে বসে খেলা দেখার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে।
যৌথ পরিচয়
বিশ্বকাপের মূল আয়োজক দেশের মতো ফিফাও এখন ‘ফেয়ার প্লে’ বা সততার মুখোশ পুরোপুরি খুলে ফেলেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ফিফার বিতর্কিত সাবেক সভাপতি সেপ ব্ল্যাটারও এর নিন্দা জানিয়েছেন। গালেয়ানোর কথাই সত্যি প্রমাণিত হলো, টুর্নামেন্টের ওপর সাম্রাজ্যবাদের দীর্ঘ ছায়া স্পষ্ট।
এই টুর্নামেন্টটি এমন এক বৈশ্বিক ব্যবস্থার চমৎকার রূপক, যা দক্ষিণের দেশগুলোতে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং তাদের সার্বভৌমত্ব হরণ করে উত্তরের উন্নয়ন ঘটায়। বিশ্বকাপকে ট্রাম্পের একটি নাট্যমঞ্চে রূপ দেওয়ার বিনিময়ে ফিফা রেকর্ড ১ হাজার ৩০০ কোটি (১৩ বিলিয়ন) ডলার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
অবশ্য এই অন্ধকারের মাঝেও কখনও কখনও আলোর দেখা মিলেছে। বর্ণ বা ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ধারণা মাঠে ভেঙে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন দলের অর্ধেকেরও বেশি খেলোয়াড়ের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। দলের ছয়জন খেলোয়াড় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। বাকিরা এসেছেন অভিবাসী পরিবার থেকে।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম মনে করতেন, জাতীয় ফুটবল দলগুলো জনমানসে একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি লিখেছিলেন, ‘লক্ষ কোটি মানুষের কল্পিত সম্প্রদায়টিকে এগারো জনের একটি দলের মধ্যে অনেক বেশি বাস্তব মনে হয়।’ সে কারণে বৈচিত্র্যময় খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত দলগুলো ট্রাম্প এবং তার সমমনাদের জাতিগত উগ্র জাতীয়তাবাদের মূলে আঘাত হেনেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি অবৈধ ও উসকানিমূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি আশা করেছিলেন, ইরানের দল হয়তো অংশই নেবে না। কিন্তু মেক্সিকো তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় এবং সেখানে বেস ক্যাম্প করার ব্যবস্থা করে দেয়। উল্লেখ্য, এই মেক্সিকো নিজেও বারবার যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের হুমকির মুখে পড়েছে।
মেক্সিকোর টিজুয়ানা শহরের স্থানীয় মানুষ ইরানের ম্যাচগুলো দেখার জন্য বিশেষ আয়োজন করেন। বিতর্কিতভাবে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর ইরান দল মেক্সিকোর মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা লেখে, ‘আপনাদের এই ভালোবাসার কথা আমাদের হৃদয়ে আজীবন জমা থাকবে।’
গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের সংহতি আবারও এক সত্যকে সামনে এনেছে। ফিফার কর্পোরেট নেতৃত্ব হয়তো ফুটবলকে একটি দীর্ঘ বিজ্ঞাপনী অনুষ্ঠানে রূপ দিতে চায়। কিন্তু খেলাটি নিজেই বিচ্ছিন্নতা ও অবহেলার বিরুদ্ধে এক পরম প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।
এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার যুগে ফুটবল এখনও সেই ‘যৌথ পরিচয়ের আদিম প্রতীক’। উরুগুয়ের লেখক গালেয়ানো ঠিক এই কথাটিই বলেছিলেন। এই প্রতীক ইনফান্তিনোর লোভের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এই প্রতীকই গাজার মানুষকে সব ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্তত ৯০ মিনিটের জন্য ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।
‘সবকিছুর দর্পণ’ ফুটবল আবারও বিশ্বের বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্বগুলোকে আমাদের চোখের সামনে মেলে ধরেছে। এটি প্রমাণ করেছে, যারা এই সুন্দর খেলাটিকে ভালোবাসেন এবং যারা এটি নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের মধ্যকার ব্যবধান দিন দিন আরও বাড়ছে।