
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই অ্যান্ডি বার্নহাম তাঁর প্রথম বড় নীতিগত প্রতিশ্রুতি হিসেবে কিয়ার স্টারমার সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় ডিজিটাল আইডি (BritCard) প্রকল্প বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। এর পরিবর্তে তিনি সরকারের অর্থ ও প্রশাসনিক সম্পদ জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় (Cost of Living Crisis) মোকাবিলায় ব্যয় করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
বার্নহামের মুখপাত্র বলেছেন, নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হবে এমন পদক্ষেপ নেওয়া, যার সুফল সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে দ্রুত অনুভব করতে পারবেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল আইডি প্রকল্প বাস্তবায়নে যে সময়, অর্থ ও জনবল ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তা এখন মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবারের আর্থিক চাপ কমানোর মতো খাতে ব্যবহার করা হবে।
স্টারমার সরকার ২০২৫ সালে ডিজিটাল আইডি চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। সরকারের দাবি ছিল, এই ব্যবস্থা অবৈধভাবে কাজ করা ঠেকানো, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সরকারি সেবাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে সহায়তা করবে। প্রস্তাবিত ডিজিটাল আইডিতে নাগরিকের নাম, জন্মতারিখ, জাতীয়তা, বসবাসের বৈধতার তথ্য এবং ছবি সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল। পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার জানায়, এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী হবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে মূলত কর্মসংস্থানের যোগ্যতা (Right to Work) যাচাইয়ের জন্য ব্যবহৃত হবে।
তবে শুরু থেকেই এই প্রকল্পকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষাকারী সংগঠন, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বিভিন্ন মহল আশঙ্কা প্রকাশ করে যে, এ ধরনের জাতীয় ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও নাগরিকের গোপনীয়তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ডিজিটাল আইডির বিরোধিতায় একটি অনলাইন আবেদনে ৩০ লক্ষেরও বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেন, যা সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
ডিজিটাল আইডি প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন ছিল। যুক্তরাজ্যের অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি (OBR) প্রকল্পটির ব্যয় উল্লেখযোগ্য হতে পারে বলে ধারণা দিলেও সরকার কখনোই এর নির্দিষ্ট বাজেট প্রকাশ করেনি। বার্নহামের মতে, এত বড় একটি প্রকল্পে বিপুল সম্পদ ব্যয় করার পরিবর্তে সেই অর্থ সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যবহার করাই বর্তমান সময়ের জন্য বেশি জরুরি।
তবে ডিজিটাল আইডি বাতিল করলেও অবৈধ কর্মসংস্থানের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানানো হয়েছে। নিয়োগদাতাদের জন্য কর্মীর বৈধতা যাচাইয়ের নিয়ম বহাল থাকবে এবং ভবিষ্যতে গিগ ইকোনমি ও ডেলিভারি খাতেও এ ধরনের যাচাই আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল আইডি বাতিলের এই সিদ্ধান্ত বার্নহাম সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। নতুন সরকার প্রযুক্তিনির্ভর বিতর্কিত প্রকল্পের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতি, পরিবারের ব্যয় সংকট এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মতো বিষয়কে সামনে রেখে জনসমর্থন অর্জনের চেষ্টা করছে।