বাংলাদেশ

সাংবিধানিক অস্পষ্টতা: দল থেকে বহিষ্কারের কারণে কি সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হয়?

16146_321.jpg

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ঘাটাঘাটি করে মোট ১১টি কারণ পাওয়া যায় যার জন‍্য একজন এমপি জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য থাকার যোগ‍্যতা হারান। সেই সাংবিধানিক কারণগুলো হলো:

১। সংশ্লিষ্ট এমপি নিজ থেকে স্পিকারের উদ্দেশ‍্যে চিঠি লিখে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করলে, [অনুচ্ছেদ ৬৭(২)]; 
২। যে দল থেকে মনোনীত হয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন সে দল থেকে পদত্যাগ করলে, [অনুচ্ছেদ ৭০(ক)]; 
৩। সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোটদান করলে, [অনুচ্ছেদ ৭০(খ)]।; 
৪। কোন উপযুক্ত আদালত (competent court) সংশ্লিষ্ট এমপিকে অপ্রকৃতিস্থ (unsound mind) ঘোষণা করলে, [অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(ক)]; 
৫। সংশ্লিষ্ট এমপি দেউলিয়া (bankrupt/undischarged insolvent) ঘোষিত হলে, [অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(খ)]; 
৬। সংশ্লিষ্ট এমপি বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন বা বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত‍্য প্রকাশ করলে, [অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(গ)]; 
৭। নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারি অপরাধে দুই বছর বা ততোধিক কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে, [অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(ঘ)]; 
৮। বাংলাদেশ কলাবোরেটার্স (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার ১৯৭২ - এর অধীনে যে কোন অপরাধের জন‍্য দন্ডিত হলে, [অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(ঙ)]; 
৯। আইনের দ্বারা কিছু পদের জন‍্য ব‍্যতিক্রম ব‍্যতিত প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত হলে, [অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(চ)]; 
১০। কোন আইনের দ্বারা বা অধীন অনুরূপ নির্বাচনের জন‍্য অযোগ্য হলে, [অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(ছ)]; 
১১। সংসদের অনুমতি ছাড়া একাধিকক্রমে নব্বই দিন সংসদে অনুপস্থিত থাকলে, [অনুচ্ছেদ ৬৭(১)]।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত হওয়া সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের জন‍্য তার দল তাকে বহিস্কার করেছে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে: তিনি কি এমপি পদে বহাল থাকতে পারবেন? গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত সাংবিধানিক অযোগ‍্যতার কোন কারণ ঘটেনি। ফলে সাংবিধানিকভাবে ও অতীতের নজীর অনুসারে তার আসন শূন্য হবার কোন কারণ দেখা যাচ্ছে না। তার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। আর ৭০ অনুচ্ছেদে দুটি কারনে আসন শূন্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে: দল থেকে পদত্যাগ করলে, [অনুচ্ছেদ ৭০(ক)] এবং সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোটদান করলে, [অনুচ্ছেদ ৭০(খ)]। তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেননি বরং তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কার করলে সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হবে এমন কথা ৭০ অনুচ্ছেদে বলা নেই। তবে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস‍্য হিসেবে থাকতে পারবেন না। তিনি অবশিষ্ট মেয়াদে থাকবেন স্বতন্ত্র (Independent) সংসদ সদস্য হিসেবে। অর্থাৎ সংখ‍্যার দিক থেকে জামায়াতে ইসলামীর একজন সংসদ সদস্য কমবে।

গণতন্ত্রের সুতিকাগার বৃটিশ পার্লামেন্টেও কোন এমপিকে তার দল বহিষ্কার করলেও তার এমপি পদ যায় না। বরং স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে বহাল থাকেন। যেমন: সাবেক লেবার লিডার জেরেমি করবিন এমপিকে লেবার পার্টি বহিস্কার করলেও তিনি স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে রিমেইনিং টার্ম বহাল ছিলেন। এভাবে সাবেক লেবার সরকারের হোম সেক্রেটারি (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী) ডায়ানা এবোট এমপি, সাবেক কনজারভেটিভ  সরকারের হেলথ সেক্রেটারি (স্বাস্থ‍্য মন্ত্রী) ম্যাট হ‍্যাংকক এমপি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ক‍্যামেরুন থমাস এমপি তাদের স্ব স্ব পার্টি থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন কিন্তু অবশিষ্ট মেয়াদে স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে কাজ করে গেছেন। এভাবে আরো কয়েক ডজন উদাহরণ দেয়া যাবে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায় আছে একই ধারার।

বাংলাদেশেও একাধিক উদাহরণ আছে যে দল থেকে বহিষ্কারের কারণে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়নি। অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন আবু হেনা। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল বিএনপি।
কিন্তু আবু হেনার সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখার রুলিং দিয়েছিলেন তৎকালীন স্পিকার ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার। অনুরূপভাবে, ফোনকল কেলেঙ্কারির পর ২০২১ সালে ডা: মুরাদ হাসানকে আওয়ামী লীগ দল থেকে বহিষ্কার করে। তাকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিলেও অবশিষ্ট মেয়াদের জন‍্য তিনি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকেন। একইভাবে গোলাম মাওলা রনিকেও তার দল আওয়ামী লীগ বহিষ্কার করেছিল কিন্তু তিনি সংসদের অবশিষ্ট মেয়াদের জন‍্য স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল ছিলেন।

আওয়ামীলীগ সরকারের মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর অবস্থা একটু ভিন্ন ধাঁচের হলেও তার বহিষ্কারের কারণে সংসদের আসন শূন্য হয়নি। বরং হয়েছিল তার পদত্যাগের কারণে। ১৯১৪ সালে নিউইয়র্কে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ সরকার মন্ত্রীত্ব ও দল থেকে বহিষ্কার করলেও এমপি হিসেবে বহাল থাকবেন কিনা এ সম্পর্কে স্পিকারের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের শুনানী শুরু করার প্রাক্কালে লতিফ সিদ্দিকী নিজেই সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে তার পদ শূন্য হয়েছিল তার নিজ থেকে পদত্যাগের কারণে, বহিস্কারের কারণে নয়।

কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল হাসিবুর রহমান স্বপন এবং ডা: মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের ক্ষেত্রে। ১৯৯৮ সালে বিএনপির সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন এবং ডা: মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায় যথাক্রমে উপমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। বিএনপি তখন তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করে। কিন্তু তাদের সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষনা না করার কারণে ব্যাপারটি উচ্চ আদালতে গড়ায়। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে নির্বাচন কমিশন তাদের সদস‍্য পদ বাতিল ঘোষণা করে। তবে বহিষ্কারের জন্য তারা তাদের সংসদ সদস্য পদ হারাননি। বরং হারিয়েছিলেন যে দল থেকে তারা নির্বাচিত হয়েছিলেন সে দল ছেড়ে সররকারে থাকা ‍দলে গিয়ে মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছিলেন। এটি বস্তুত দলত্যাগের শামিল (This is tentamoint to floor crossing)।

তবে হ‍্যাঁ, ৭০ অনুচ্ছেদে যাই থাকুক না কেন, সব জল্পনা-কল্পনা, মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও প্রশ্নের অবসান হবে যদি গাজী নজরুল ইসলাম নিজ থেকে স্বেচ্ছায় সংসদ সদস্য পদ থেকে থেকে পদত্যাগ করেন। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৭(২) অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলাম স্পিকারের নিকট স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে পদত্যাগ করতে পারবেন। গাজী নজরুল ইসলাম যে ন‍্যাক্কারজনক কান্ড ঘটিয়েছেন তার জন‍্য সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়া হবে চরম বিব্রতকর, অস্বস্তিকর, হাস্যকর ও লজ্জাজনক। ফলে নিজ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে সংসদ থেকে সরে আসা বরং তার জন‍্য হবে শ্রেয়।

তবে পূরো সংবিধান, বিশেষ করে ৭০ অনুচ্ছেদ পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে আমাদের সংবিধানে একটি ছিদ্রপথ (loophole) বা অস্পষ্টতা (ambiguity) আছে যার ফলে বহিস্কারের পরও এমপি হিসেবে থেকে যান। দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে কিংবা দল ছাড়লে সংসদ সদস্যপদ থাকবে না, তা সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর যদি তার দল তাকে বহিষ্কার করে, সে ক্ষেত্রে কী হবে—তা সংবিধানে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা নেই। এমতাবস্থায় জাতীয় সংসদ চাইলে অতি সহজেই সংবিধান সংশোধন করে একটি বাক্য ৭০ অনুচ্ছেদে সংযোজন করতে পারে “উক্ত দল হইতে বহিষ্কৃত হলে”। ব্যাস, আর কোন অস্পষ্টতা বা শূন্যতা থাকবে না। বর্তমান সরকারের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। তারা চাইলেই বিরোধী দলের কোন ধরনের সাপোর্ট ছাড়া অনায়াসেই এই সংশোধনী নিয়ে আসতে পারেন।

 

- নাজির আহমদ
বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।
ইমেইল: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও