
ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার অভিযোগে তদন্তাধীন লন্ডনভিত্তিক একটি ইসলামিক চ্যারিটি এখনও যুক্তরাজ্যে বিদেশ থেকে দক্ষ কর্মী ও ধর্মীয় মন্ত্রী (মিনিস্টার অব রিলিজিয়ন) আনার জন্য হোম অফিসের স্পনসর লাইসেন্স ধরে রেখেছে। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
লন্ডনের মাইডা ভেইলে অবস্থিত ইসলামিক সেন্টার অব ইংল্যান্ড এখনও হোম অফিসের অনুমোদিত স্পনসর প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে। এই লাইসেন্সের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি কর্মীদের জন্য স্পনসরশিপ সার্টিফিকেট ইস্যু করতে পারে, যার ভিত্তিতে তারা যুক্তরাজ্যের ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে হোম অফিস জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ ২০২২ সালে এই সুবিধা ব্যবহার করে কর্মী স্পনসর করেছিল।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পরিচালন ব্যবস্থা এবং ইরানের সরকারের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে চ্যারিটি কমিশনের তদন্ত চলছে। তদন্তের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের গঠনতন্ত্র থেকে এমন একটি বিধান অপসারণ করেছে, যেখানে বোর্ড অব ট্রাস্টিজে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একজন ধর্মীয় প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ ছিল।
ইসলামিক সেন্টার অব ইংল্যান্ড অতীতেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে সমালোচনার মুখে পড়ে। এক কমিউনিটি বাজারে ইরানের শাসকগোষ্ঠী ও লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট প্রতীকযুক্ত কী-রিং, মোবাইল ফোন কভার ও স্টিকার বিক্রির অভিযোগ ওঠে। সেখানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর নিহত কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানির ছবিযুক্ত সামগ্রীও বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর কেন্দ্রটি তার স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচিরও আয়োজন করেছিল।
কেন্দ্রটির ইমাম ও পরিচালক সাইয়্যেদ হাশেম মুসাভি অতীতে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের "শয়তানের সৈনিক" বলে অভিহিত করেছিলেন, যা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিকরা প্রশ্ন তুলেছেন, যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি বৈরী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে তদন্তাধীন, তাদের বিদেশি কর্মী আনার ক্ষমতা বহাল রাখা কতটা যৌক্তিক। রাজনৈতিক সহিংসতা বিষয়ক সাবেক সরকারি উপদেষ্টা লর্ড ওয়ালনি বলেছেন, তদন্ত চলাকালীন ইসলামিক সেন্টার অব ইংল্যান্ডের স্পনসর লাইসেন্স বহাল থাকা "উদ্বেগজনক"। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি ভিসা স্পনসরশিপের নিয়ম আরও কঠোর করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে ইসলামিক সেন্টার অব ইংল্যান্ড সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেছেন, তারা যুক্তরাজ্যের আইনের অধীনে পরিচালিত একটি স্বাধীন নিবন্ধিত চ্যারিটি এবং কোনো সরকার, রাজনৈতিক সংগঠন বা ব্যক্তির সরকারি প্রতিনিধি নয়। তিনি জানান, অন্যান্য ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মতো তাদেরও বৈধভাবে হোম অফিসের স্পনসর লাইসেন্স রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অভিবাসন শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তারা দক্ষ কর্মীদের স্পনসর করতে পারে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও প্রতিষ্ঠানটি বরাবরই নিজেদের স্বাধীন ও জনকল্যাণমূলক সংগঠন হিসেবে দাবি করে এসেছে।
এদিকে উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের উইলেসডেনে অবস্থিত ইসলামিক কলেজও হোম অফিসের অনুমোদিত স্পনসর প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে। কলেজটি ইরানের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাঈদ রেজা আমেলি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা আল-মুস্তাফা ইউনিভার্সিটির সঙ্গে কলেজটির সম্পর্ক থাকার অভিযোগ উঠলেও প্রতিষ্ঠানটি তা ভিত্তিহীন বলে অস্বীকার করেছে।
হোম অফিসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী-সম্পর্কিত যেকোনো হুমকিকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। তদন্তে কোনো অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা, লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।