
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলকে আরও উন্নত করতে প্রযুক্তি খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠান লাখ লাখ বই কিনে সেগুলোর মলাট কেটে স্ক্যান করার পর ধ্বংস করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট ৪০৪ মিডিয়ার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিরল ও পুরোনো বই সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন কোম্পানি ও ঠিকাদার নিয়োগ দিচ্ছে। এসব বই উচ্চগতির স্ক্যানিং যন্ত্রে ডিজিটাল কপি তৈরির আগে মলাট বা বাঁধাই অংশ কেটে ফেলা হয় এবং পরে মূল বইগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।
নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বিশ্বের বৃহত্তম বইয়ের ডেটাবেস বলে দাবি করা সংস্থা আইএসবিএনডিবি বলছে, ২০২২ সালের আগের প্রকাশিত বইগুলোকে এআই প্রশিক্ষণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী মনে করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ, এসব বইয়ে এআই-সৃষ্ট লেখা থাকার সম্ভাবনা নেই। এর মাধ্যমে নিম্নমানের এআই-নির্ভর কনটেন্ট থেকে নতুন মডেলগুলোকে দূরে রাখা সম্ভব বলে তারা মনে করছে।ওয়াশিংটন পোস্টের জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের এক সহ-প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন, বই দিয়ে প্রশিক্ষণ দিলে এআই আরও ভালোভাবে লিখতে শিখবে এবং নিম্নমানের ইন্টারনেটভিত্তিক ভাষা তৈরি করবে না। ৪০৪ মিডিয়ার দাবি, এআই কোম্পানিগুলো ‘মডেল কলাপস’ এড়াতে বিপুলসংখ্যক বই সংগ্রহ করছে। ‘মডেল কলাপস’ বলতে বোঝানো হয় এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে এআই মডেল যদি বারবার এআই-সৃষ্ট নিম্নমানের তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়, তাহলে সময়ের সঙ্গে তার মান কমতে থাকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিরল বই বিক্রেতাদের কাছে সাধারণত একজন ক্রেতা এক বা দুটি বই কেনেন। কিন্তু এখন কিছু প্রতিষ্ঠান এক হাজার থেকে শুরু করে ১০ লাখ পর্যন্ত বই কেনার অর্ডার দিচ্ছে।
এর আগে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, অ্যানথ্রপিক লাখো বই কিনে মলাট কেটে স্ক্যান করে তাদের চ্যাটবট ‘ক্লড’-এর প্রশিক্ষণে ব্যবহার করেছে। পরে কয়েকজন লেখক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, অনুমতি ছাড়াই বইয়ের পাইরেটেড সংস্করণ ব্যবহার করে ক্লডকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পরে অ্যানথ্রপিক ১৫০ কোটি ডলারে ওই মামলা নিষ্পত্তি করে।
তবে মামলার রায়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারক উইলিয়াম আলসাপ বলেন, যেসব বই বৈধভাবে কেনা হয়েছিল, সেগুলোর ডিজিটাল কপি তৈরির পর মূল বই ধ্বংস করা হয়েছে এবং ডিজিটাল কপিগুলো প্রতিষ্ঠানের বাইরে প্রকাশ, বিক্রি বা বিতরণ করা হয়নি। ফলে এটি ‘ফেয়ার ইউজ’-এর আওতায় পড়ে। তবে একই সঙ্গে তিনি রায় দেন, সাত মিলিয়নের বেশি পাইরেটেড বই সংরক্ষণ করে প্রতিষ্ঠানটি কপিরাইট লঙ্ঘন করেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, অ্যানথ্রপিক তাদের বই স্ক্যান প্রকল্পের নাম দিয়েছিল ‘প্রজেক্ট পানামা’। নথিতে লেখা ছিল, বিশ্বের সব বই ধ্বংসাত্মক পদ্ধতিতে স্ক্যান করার প্রচেষ্টা এটি। আমরা চাই না মানুষ জানুক যে আমরা এ নিয়ে কাজ করছি।
বই ধ্বংসের এ প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কংগ্রেস সদস্য ব্র্যাড কারসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, বর্তমান আইনি কাঠামো বই সংরক্ষণের চেয়ে ধ্বংস করাকেই উৎসাহিত করছে।
স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক বলেন, তিনি তার প্রতিষ্ঠানের এআই টিমকে নির্দেশ দিয়েছেন, বিরল বই থাকলে সেগুলো ধ্বংস না করে বিকল্প উপায়ে স্ক্যান করে সংরক্ষণ করতে।
ফ্যাক্টরি এআইয়ের প্রধান নির্বাহী মাতান গ্রিনবার্গ বলেন, যান্ত্রিকভাবে বই ধ্বংস করার মধ্যে মানববিরোধী একটি দিক রয়েছে। ইতিহাস সাধারণত বই ধ্বংসকারীদের ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে না।
অন্যদিকে, লেখকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ফেয়ারলি ট্রেইনড’-এর প্রতিষ্ঠাতা এড নিউটন-রেক্স বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যেভাবে গোপনে বই সংগ্রহ করছে, সেটিই প্রমাণ করে তারা জানে বিষয়টি জনসমক্ষে ভালোভাবে গ্রহণ করা হবে না।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি ব্যবহৃত বই এক ডলারে কিনে সেটি দিয়ে বাণিজ্যিক এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া, যা পরে সেই লেখকের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করবে এটিকে কি গ্রহণযোগ্য বলা যায়?
প্রতিবেদন প্রকাশের পর আইএসবিএনডিবি এক বিবৃতিতে দাবি করে, তারা কখনো এআই প্রশিক্ষণের জন্য বই কেনা, স্ক্যান বা বিক্রি করেনি।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, আমরা কোনো এআই মডেল প্রশিক্ষণ দিই না এবং কখনও দিইনি। ওয়েবসাইটে থাকা পৃষ্ঠাটি ছিল বাজারের আগ্রহ যাচাইয়ের একটি পরীক্ষা। সেই সেবা কখনও চালু করা হয়নি এবং পৃষ্ঠাটি ইতোমধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তারা আরও জানায়, দুই দশকের বেশি সময় ধরে বই সম্পর্কিত তথ্যভান্ডার হিসেবে কাজ করছে এবং তাদের কার্যক্রম বইয়ের তথ্য নিয়েই সীমাবদ্ধ, বই সংগ্রহ বা ধ্বংসের সঙ্গে নয়।