
মাত্র একটি সাধারণ ধারণা থেকেই জন্ম নিতে পারে অসাধারণ কোনো উদ্যোগ। ঠিক এমনই এক ভাবনা থেকে শুরু হয়েছিল শাহজালাল জামিয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেটের ১৯৯১ ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের “ওয়ান মিলিয়ন স্টেপ চ্যালেঞ্জ”, যা পরবর্তীতে স্বাস্থ্য সচেতনতা, মানসিক সুস্থতা, আজীবনের বন্ধুত্ব এবং মানবিক সহায়তার এক অনন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
মোট ৯২ দিনব্যাপী (মে থেকে জুলাই ২০২৬) এই চ্যালেঞ্জে যুক্তরাজ্য, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত ১৫ জন জামিয়ান প্রতিদিন যত বেশি সম্ভব হাঁটার লক্ষ্য নিয়ে অংশ নেন। প্রত্যেকের লক্ষ্য ছিল অন্তত ১০ লাখ (এক মিলিয়ন) পদক্ষেপ সম্পন্ন করা।
ব্যস্ত চাকরি, ব্যবসা, পরিবার ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব সামলেও অংশগ্রহণকারীরা নিয়মিত হাঁটা অব্যাহত রাখেন। এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে ব্যস্ত জীবনযাত্রার মধ্যেও স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব।
তবে এই চ্যালেঞ্জ শুধু পদক্ষেপ গণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি পরিণত হয়েছিল বন্ধুত্ব, পারস্পরিক অনুপ্রেরণা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য উদাহরণে।
তিন দশকের বন্ধুত্ব, চার দেশে এক বন্ধন
এই ১৫ জন অংশগ্রহণকারী প্রথম পরিচিত হন সিলেটের শাহজালাল জামিয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষাজীবনের সময়। তিন দশকেরও বেশি সময় আগে গড়ে ওঠা সেই বন্ধুত্ব আজও অটুট রয়েছে।
বর্তমানে তারা যুক্তরাজ্য, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে বসবাস করছেন। কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ শিক্ষক, কেউ পরিসংখ্যান বিশ্লেষক, কেউ ব্যবসায়ী, রন্ধনশিল্পী, পরিবহন খাতের পেশাজীবী কিংবা উদ্যোক্তা। ভৌগোলিক দূরত্ব তাদের সম্পর্ককে দুর্বল করতে পারেনি; বরং সময়ের সঙ্গে সেই বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে।
‘ওয়ান মিলিয়ন স্টেপ চ্যালেঞ্জ’ ছিল সেই বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী করার একটি ইতিবাচক উপলক্ষ, যেখানে প্রতিদিনের উৎসাহ, শুভেচ্ছা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছে।
৯২ দিনের স্বাস্থ্যযাত্রা
২০২৬ সালের মে মাসে শুরু হয়ে জুলাই পর্যন্ত চলা এই চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণকারীরা প্রতিদিনের হাঁটার হিসাব ডিজিটাল স্টেপ-ট্র্যাকিং অ্যাপ StepsApp-এর মাধ্যমে সংরক্ষণ করেন।
প্রতিদিনের অগ্রগতি, র্যাংকিং এবং বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা অংশগ্রহণকারীদের আরও বেশি হাঁটতে উদ্বুদ্ধ করেছে। অনেকেই প্রতিদিন হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলেন, যা ভবিষ্যতেও ধরে রাখার অঙ্গীকার করেন।
এই উদ্যোগের ফলে অংশগ্রহণকারীরা শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও উপকৃত হন। নিয়মিত হাঁটার মাধ্যমে তারা চাপমুক্ত হওয়া, প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানো, নতুন উদ্যমে কাজ করা এবং দীর্ঘদিনের বন্ধুদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার সুযোগ পান।
হাঁটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বজুড়ে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হাঁটাকে সবচেয়ে নিরাপদ, সহজ এবং কার্যকর ব্যায়ামগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেন।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS) নিয়মিত দ্রুত হাঁটার পরামর্শ দিয়ে থাকে। তাদের মতে, প্রতিদিন মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটলেও শরীর ও মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নিয়মিত হাঁটার উপকারিতার মধ্যে রয়েছে—
জামিয়া ১৯৯১ ব্যাচের অংশগ্রহণকারীরাও এই সুফল বাস্তবে অনুভব করেছেন। অনেকেই জানান, তিন মাসে তাদের শারীরিক সক্ষমতা বেড়েছে, কর্মশক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মানসিক প্রশান্তি অর্জিত হয়েছে।
স্বাস্থ্যচর্চার পাশাপাশি মানবিক উদ্যোগ
এই চ্যালেঞ্জের অন্যতম বিশেষ দিক ছিল এর মানবিক উদ্দেশ্য।
প্রতিটি অংশগ্রহণকারী ৯২ দিনের জন্য প্রতিদিন ১ পাউন্ড করে অনুদান দেওয়ার অঙ্গীকার করেন I এখন পর্যন্ত £৩৫০ সংগৃহিত হয়েছে। সর্বমোট £১০০০+ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে।
সংগৃহীত এই অর্থ বাংলাদেশের British Bangladesh Mobility Opportunities Society (BBMOS)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটি শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের চলাচলের সুবিধা বৃদ্ধি, সহায়ক উপকরণ প্রদান এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে।
অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, নিজের স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এটি ছিল এক অনন্য সুযোগ।
প্রযুক্তির মাধ্যমে একসঙ্গে পথচলা
দৈনিক হাঁটার হিসাব সংরক্ষণে StepsApp ব্যবহারের ফলে সবাই বাস্তবসম্মতভাবে নিজেদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন।
প্রতিদিনের ফলাফল দেখে কেউ পিছিয়ে পড়তে চাননি। ফলে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ইতিবাচক উৎসাহ সৃষ্টি করে এবং পুরো ৯২ দিন সবাইকে সক্রিয় রাখে।
যাঁদের ভাবনায় এই উদ্যোগ
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন যুক্তরাজ্যের কভেন্ট্রিতে কর্মরত অভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তা আনসার ইসলাম। বন্ধুদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে তিনি এই উদ্যোগের সূচনা করেন।
অন্যদিকে, লন্ডনে কর্মরত পরিসংখ্যান বিশ্লেষক ড. মুর্শেদ সিদ্দিক ডিজিটাল স্টেপ-ট্র্যাকিং অ্যাপ StepsApp ব্যবহারের ধারণা দেন, যা পুরো চ্যালেঞ্জকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
এক মিলিয়ন স্টেপ সম্পন্নকারী আট বিজয়ী
৯২ দিনের এই চ্যালেঞ্জে আটজন অংশগ্রহণকারী সফলভাবে এক মিলিয়নেরও বেশি পদক্ষেপ সম্পন্ন করেন।
তাঁরা হলেন—
???? আনসার ইসলাম — ২৫,৪০,৮৯১ পদক্ষেপ
???? রফিকুজ্জামান শাহীন — ১৫,৫০,১৪১ পদক্ষেপ
???? আমীর খাসরু — ১৩,৪৫,৮৯৮ পদক্ষেপ
???? ড. মুর্শেদ সিদ্দিক — ১২,৩০,১২৯ পদক্ষেপ
???? শুইভ খান — ১০,৯৮,০৬৮ পদক্ষেপ
???? শিপন চৌধুরী — ১০,৭৮,০৪৫ পদক্ষেপ
???? মুহাম্মদ কাউসার — ১০,৬৪,০১৩ পদক্ষেপ
???? শামীম ইকবাল — ১০,০০,০০০ পদক্ষেপ
তাঁদের ধারাবাহিকতা, নিষ্ঠা ও আত্মনিয়োগ অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীই সফল
যদিও সবাই এক মিলিয়ন পদক্ষেপের লক্ষ্য স্পর্শ করতে পারেননি, তবুও প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর আন্তরিক প্রচেষ্টা এই উদ্যোগকে সফল করেছে।
তাদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রতিদিনের উৎসাহই এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।
বার্ষিক আয়োজনের ঘোষণা
চ্যালেঞ্জটির ব্যাপক সফলতার পর আয়োজকেরা জানিয়েছেন, “ওয়ান মিলিয়ন স্টেপ চ্যালেঞ্জ” এখন থেকে প্রতিবছর আয়োজন করা হবে।
আগামী বছর আরও বেশি প্রাক্তন শিক্ষার্থী, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের এই উদ্যোগে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন মানবিক কাজে অর্থ সংগ্রহের কার্যক্রমও আরও বিস্তৃত করা হবে।
এক অনুপ্রেরণার গল্প
শাহজালাল জামিয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৯৯১ ব্যাচের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, পরিবর্তনের শুরু হয় একটি ছোট সিদ্ধান্ত থেকে—প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার মধ্য দিয়েই।
মাত্র তিন মাসে ১৫ জন বন্ধু স্বাস্থ্য সচেতনতা, মানসিক সুস্থতা, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এবং মানবিক সহায়তাকে এক সুতোয় গেঁথে একটি আন্তর্জাতিক উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, ভৌগোলিক দূরত্ব কখনো প্রকৃত বন্ধুত্বের বাধা হতে পারে না। ব্যস্ত পেশাজীবনও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার অন্তরায় নয়। আর ছোট ছোট ব্যক্তিগত উদ্যোগ একত্রিত হলে তা সমাজে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, এটি শুধু এক মিলিয়ন পদক্ষেপের গল্প নয়; এটি সুস্থ জীবন, অটুট বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার পথে লক্ষ লক্ষ পদক্ষেপের এক অনন্য যাত্রা।