রাজনীতি

'রাষ্ট্রপতি' পদ হচ্ছে সংবিধান ও দেশের সর্বোচ্চ পদ: নামের আগে রাষ্ট্রপতি পদবির সাথে অন‍্য পদবি যোগ করা বেমানান!

16329_123.jpg

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের 'রাষ্ট্রপতি' পদ হচ্ছে সংবিধান ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ, হেড অব দ‍্য স্টেট। রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন রাষ্ট্রের অভিভাবক (Guardian)। তাকে ঘিরেই রাষ্ট্রের প্রায় সবকিছু আবর্তিত হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির আদেশে, রাষ্ট্রপতির নামে বা রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে রাষ্ট্রের কার্যাবলী পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রাচার (Warrant of Precedence) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির স্থান প্রথমে, ক্রমিক নম্বর ১। কোন ব‍্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হলে তাঁর রাষ্ট্রপতি পদের সাথে তাঁর আর অতীতের ধারণ (hold) করা পদবি ব‍্যবহার করা বেমানান, দৃষ্টিকটু ও অপ্রয়োজনীয়।

বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। কিছুদিন আগে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু পদত্যাগ করলে স্পিকার হিসেবে সংবিধান অনুযায়ী হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হোন। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রপতির সব দায়িত্ব পালন করে যাবেন। স্পিকার থাকাকালীন সময়ে, এমনকি অতীতে মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে এবং বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নামের আগে রাষ্ট্রপতি পদবির সাথে মেজর (অব:) বলা বা লেখা হয়। এটা একেবারে বেমানান ও প্রয়োজনহীন।

সেনাবাহিনীতে মেজর পদবী অনেক জুনিয়র পদবী। রাষ্ট্রাচার অনুযায়ী একেবারে নীচের স্তর, অর্থাৎ ক্রমিক নম্বর ২৫। উপসচিবের সমপর্যায়ের পদবী, রাষ্ট্রাচার অনুযায়ী জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারেরও নীচে। রাষ্ট্রপতি পদবীর সাথে এই পদবি বলা বা লেখার আদৌ কোনো দরকার আছে?  রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুও তো সাবেক জেলা জজ ছিলেন এবং বর্তমান রাষ্ট্রচার অনুযায়ী জেলা জজের পদবি সচিবের পদমর্যাদার (ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স অনুযায়ী উভয়ের ক্রমিক ১৬)। তাহলে তাঁর নামের আগে কি লিখা হতো বা সম্মোধন করা হতো রাষ্ট্রপতি জেলা জজ (অব:) মুহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু? নিশ্চয়ই না। তাহলে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি পদবির সাথে মেজর (অব:) লেখার যৌক্তিকতা কি?

আইনজীবীদের প্রফেশনাল পদবি হচ্ছে এডভোকেট। বৃটেনে উচ্চ আদালত যারা প্র‍্যাকটিস করেন তাদেরকে ব‍্যারিস্টার বলা হয়। একজন এডভোকেট বা ব‍্যারিস্টার যখন বিচারপতি হোন তখন সংশ্লিষ্ট ব‍্যক্তির নামের আগে বিচারপতি পদবি লিখা বা বলার পর এডভোকেট বা ব‍্যারিস্টার পদবি কখনো বলা হয় না বা লিখা হয় না। কারণ সহজ ও বোধগম্য। উচ্চতর পদবিধারী ব‍্যক্তির পদবির সাথে অতীতে ধারণ করা নিচের পদবি বলা হয় না বা লিখা হয় না। এটা বৃটেনে অনুসরণ করা হয়, এমনকি বাংলাদেশেও অনুসরণ করা হয়। যেমন সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল বাংলাদেশের অন‍্যতম সেরা ও মেধাবী বিচারপতি ছিলেন। বিচারপতি হওয়ার আগে তিনি ব‍্যারিস্টারও ছিলেন। কিন্তু তাঁর নাম উচ্চারিত হলে তাঁর বিচারপতি পদবির সাথে ব‍্যারিস্টার পদবি বলা হয় না বা লিখা হয় না। এভাবে উপমহাদেশের সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদসহ আরো অনেক বিচারপতি আছেন যারা বিচারপতি হওয়ার আগে ব‍্যারিস্টার ছিলেন। কিন্তু বিচারপতি পদবির সাথে তাদের ব‍্যারিস্টার পদবি বলা হয় না বা লিখা হয় না।

বৃটেনেও একই রীতি ও আচার প্রচলিত। গত শতাব্দী এবং বর্তমান শতাব্দীর দুই জন খ‍্যাতিমান বিচারপতি ছিলেন যথাক্রমে লর্ড ডেনিং এবং লর্ড বিংহ‍্যাম। তাঁরা প্রফেশনে থাকতে খ‍্যাতিমান ব্যারিস্টার ছিলেন। কই, তাদের নামের আগে লর্ড (উল্লেখ্য, বৃটেনের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতির পদবি লর্ড) পদবি বলা বা লিখার পর তো ব্যারিস্টার পদবি লিখা হয় না বা বলা হয় না। টনি ব্লেয়ার ও কিয়ার স্টারমার দুজনই বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তারা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে সিনিয়র ব‍্যারিস্টার ছিলেন। কিয়ার স্টারমার তো সাবেক কুইন’স কাউন্সেল (Queen’s Counsel - QC) ও বর্তমান কিং’স কাউন্সেল (King’s Counsel- KC)। কই, তারা প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা অবস্থায় কখনও তাদের প্রধানমন্ত্রী পদবির সাথে ব‍্যারিস্টার পদবি কখনো বলা হয়নি বা লিখা হয়নি।

বাংলাদেশের অনেক প্রতিথযশা এডভোকেট সুপ্রিম কোর্টের অতীতে বিচারপতি হয়েছেন, বর্তমানে হচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও হবেন। অনেকে এডভোকেট থেকে পর্যায়ক্রমে প্রধান বিচারপতি হয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও হবেন। বিচারপতি হবার পর বিচারপতি পদবির সাথে এডভোকেট পদবি লেখা হয় না। লিখলে বা বললে বেমানান লাগতো। রাষ্ট্রাচার অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদবি বিচারপতির অনেক উপরে, এমনকি প্রধান বিচারপতির দুই ধাপ উপরে। তাহলে এডভোকেট আব্দুল হামিদ যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন তাঁর নামের আগে কেন যে রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদ বা রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এডভোকেট বলা হতো বা লিখা হতো তা বোধগম্য নয়। এটা ছিল একবারে বেমানান ও দৃষ্টিকটু। অথচ রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসও রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে এডভোকেট ছিলেন। কই, তাঁর নামের আগে তো রাষ্ট্রপতি পদবির সাথে এডভোকেট পদবি লেখা হতো না। এটাই সঠিক নিয়ম।

স্পিকার পদবির ক্ষেত্রেও দেখা যায় অনেক সময় অতীতের ধারণ করা পদবি লিখা হয় বা সম্মোধন করা হয়। যেমন শওকত আলী জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ছিলেন, ছিলেন কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার। তিনি অতীতে সেনাবাহিনীর কর্নেল ছিলেন। তাঁকে সম্মোধনের ক্ষেত্রে ডেপুটি স্পিকার বা স্পিকার পদবির পর কর্নেল (অব:) শওকত আলী বলে সম্মোধন করা হতো। তিনি তো সুপ্রিম কোর্টের তালিকাভুক্ত এডভোকেটও ছিলেন, তবে এই পদবি তাঁকে কখনো ব্যবহার করতে বা তাঁকে সম্মোধন করতে দেখিনি। সেনাবাহিনীতে কর্নেল র‍্যাংক মধ‍্যম সারির পদবি, রাষ্ট্রাচার অনুযায়ী ক্রমিক নম্বর ২২। আর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের ক্রমিক নম্বর রাষ্ট্রাচার অনুযায়ী যথাক্রমে ৩ ও ৬। সুতরাং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদবির পর কর্নেল (অব:) লেখা অপ্রয়োজনীয়।

কিছু সম্মান ও উপাধি যে কোন রাষ্ট্র তার বিশিষ্ট, কৃতি ও অসাধারণ নাগরিককে প্রদান করে তাঁর অদম্য বীরত্ব, অসীম সাহসীকতা ও সমাজের জন্য দৃষ্টান্তমূলক কাজ বা রাষ্ট্রের প্রতি অসামান্য অবদানের জন‍্য। এই সম্মান সব সময় সব পদবির সাথে বলা যায় এবং লিখা যায়। যেমন হাফিজ উদ্দিন আহমদকে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন‍্য রাষ্ট্র “বীর বিক্রম” উপাধিতে ভূষিত করেছে। এটা হাফিজ উদ্দিন আহমদের সব পদবির সাথে যায়। তাঁর রাষ্ট্রপতি পদবির সাথে “বীর বিক্রম” উপাধি লিখতে বা বলতে কোন বেমানান তো হবেই না বরং তা হবে রাষ্ট্রপতি পদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সংগতিপূর্ণ।

বৃটেনেও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের অবদানের জন‍্য স্বীকৃতি ও উপাধি দেয়া হয়। যেমন আইনের জগতে ডাইরেক্ট অব পাবলিক প্রসিকিউটর (DPP) হিসেবে অসাধারণ ভূমিকা পালন করার জন‍্য তৎকালীন গ্রেট বৃটেনের রানী কিয়ার স্টারমারকে “স‍্যার” উপাধি দিয়েছিলেন। এই উপাধি তাঁকে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রানী দিয়েছিলেন। সব সময় নামের সাথে এই উপাধি বলা হতো বা লিখা হতো। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করে চলে যাবার পরও এখনো নামের আগে সে উপাধি লেখা হয় বা তাকে সে উপাধিতে সম্মোধন করা হয়। খোদ পার্লামেন্টে স্পিকার যখন তাকে কথা বলার জন‍্য আহবান করতেন তাকে তখন তাঁর নামের পূর্বে এই “স‍্যার” উপাধি উল্লেখ করে ডাকতেন। 

নামের আগে পদ, পদবি ও উপাধি লিখতে ও সম্বোধনে সমাজ ও রাষ্ট্রে সুন্দর রীতি, পদ্ধতি ও আচার চর্চা ও অনুসরণ করা দরকার। ভুল ও বেমানান রীতি দীর্ঘদিন চর্চার ফলে সঠিক রীতি ও ধারা অনেক সময় মনে হতে পারে বিরল বা অদ্ভুত (Uncommon) ও বেখাপ্পা। তাই বিকাশমান গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের পদ, পদবি ও উপাধি সম্পর্কে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সংগতিপূর্ণ ধারা সমাজে প্রচলন ও অনুসরণে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। আর সেই জনসচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

ইমেইল: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও