যুক্তরাজ্য

Mirror
১০ আগস্ট ২০২৬, ১৪:০৮
আরও খবর

যুক্তরাজ্যে ৯০ পেনির পার্কিং টিকিট নিয়ে আড়াই বছরের লড়াই; আদালতে জিতে ক্ষতিপূরণ পেলেন £২৮৯

16341_434.jpg

পার্কিং ফি হিসেবে মাত্র ৯০ পেনস পরিশোধ করেও জরিমানার মুখে পড়েছিলেন ৭৬ বছর বয়সী জন ওয়াটার্স। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বেসরকারি পার্কিং কোম্পানি ও ঋণ আদায়কারী সংস্থার দাবির বিরুদ্ধে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত আদালতে নিজের পক্ষে রায় পেয়েছেন তিনি। উল্টো ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেয়েছেন £২৮৯.৫০।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কেন্টের হেডকর্নের ফোরম্যান সেন্টার কার পার্কে স্ত্রীকে নিয়ে যান জন ওয়াটার্স। সেখানে এক ঘণ্টার জন্য গাড়ি পার্ক করতে তিনি ৯০ পেনস পরিশোধ করেন এবং পার্কিং মেশিনে নিজের গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বরও দেন। কিন্তু টিকিট হাতে পাওয়ার পর তিনি দেখতে পান, সেখানে তার গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বরের শেষ চারটি সংখ্যা মাত্র ছাপা হয়েছে। জন মনে করেছিলেন, অন্য গাড়িতে টিকিটটি ব্যবহার ঠেকাতেই হয়তো এভাবে নম্বর দেখানো হয়েছে।

পার্কিং করার মাত্র ৩৬ মিনিট পর তিনি গাড়ি নিয়ে চলে যান। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ পর সিভিল এনফোর্সমেন্ট নামের একটি বেসরকারি পার্কিং কোম্পানি থেকে জরিমানার নোটিশ পেয়ে তিনি অবাক হয়ে যান। চিঠিতে দাবি করা হয়, তিনি সঠিকভাবে পার্কিং ফি পরিশোধ করেননি এবং তাকে £১০০ জরিমানা দিতে হবে। ১৪ দিনের মধ্যে পরিশোধ করলে জরিমানার পরিমাণ £৬০ হবে বলেও জানানো হয়।

জনের কাছে পার্কিং টিকিটের কপি ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট ছিল। তিনি এসব প্রমাণ কোম্পানির কাছে পাঠিয়ে জরিমানা বাতিলের আবেদন করেন। কিন্তু তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। পরে কোম্পানি তাকে £২০ পরিশোধের প্রস্তাব দেয়। তাদের দাবি ছিল, জন গাড়ির সম্পূর্ণ রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেননি।

তবে জন সেই অর্থও দিতে অস্বীকৃতি জানান। তার যুক্তি ছিল, পার্কিং টিকিটে তার গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের শেষ চারটি সংখ্যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল এবং তিনি ইতোমধ্যে পার্কিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করেছেন। তিনি বলেন, £২০ পরিশোধ করা মানে তার দেওয়া ৯০ পেনির তুলনায় প্রায় ২ হাজার শতাংশ বেশি অর্থ দেওয়া। বিষয়টি তার কাছে নীতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং অযৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে অর্থ দিতে তিনি রাজি ছিলেন না।

কোম্পানি তার আপিল প্রত্যাখ্যান করার পর জরিমানার পরিমাণ বেড়ে £১৭০ করা হয় এবং বিষয়টি ঋণ আদায়কারী সংস্থার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রায় দুই বছর ধরে জনের কাছে একের পর এক দাবি ও সতর্কবার্তার চিঠি আসতে থাকে। ডাইরেক্ট কালেকশন বেইলিফস নামের একটি সংস্থাও তার কাছে £১৭০ পরিশোধের দাবি জানায়। জন প্রতিটি চিঠির জবাব দিয়ে নিজের কাছে থাকা প্রমাণ তুলে ধরেন এবং জানিয়ে দেন, প্রয়োজনে তিনি কাউন্টি কোর্টে নিজের বক্তব্য তুলে ধরবেন।

আড়াই বছর ধরে চলা এই বিরোধের শেষ পর্যায়ে আদালতে সিভিল এনফোর্সমেন্ট জনের কাছে £২৭৭ দাবি করছিল। জন নিজের বিরুদ্ধে আনা দাবি খারিজের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের চাপ, উদ্বেগ ও হয়রানির জন্য পাল্টা ক্ষতিপূরণও দাবি করেন।

ডেপুটি ডিস্ট্রিক্ট জজ চ্যান সিভিল এনফোর্সমেন্টের দাবি খারিজ করে দেন এবং জনের পাল্টা দাবিও গ্রহণ করেন। আদালত তাকে মোট £২৮৯.৫০ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এর মধ্যে £২৫০ ছিল তার পাল্টা দাবির অর্থ। আদালতের অন্যান্য খরচের পাশাপাশি আদালতে পার্কিংয়ের জন্য দেওয়া £৪.৫০-ও ক্ষতিপূরণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

রায়ের পর জন বলেন, মামলাটি শেষ হওয়ায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি হতাশ যে বেসরকারি পার্কিং কোম্পানিগুলো এখনও মানুষের কাছ থেকে এমনভাবে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। তার মতে, অনেক মানুষ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানেন না এবং এসব কোম্পানির চাপে অযাচিত জরিমানাও পরিশোধ করে দেন।

জনের পরামর্শ, পার্কিংয়ের টিকিট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চিঠিপত্র এবং কোম্পানির সঙ্গে হওয়া সব যোগাযোগের প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত। তার ভাষ্য, এসব নথি থাকলে কোনো অন্যায্য দাবির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান প্রমাণ করা অনেক সহজ হয়।

মামলায় জন পার্কিং সংক্রান্ত একটি আগের আদালতের রায়ের নজিরও তুলে ধরেছিলেন। সেখানে বলা হয়েছিল, কোনো গাড়িচালক যদি নির্ধারিত সময়ের জন্য সম্পূর্ণ পার্কিং ফি পরিশোধ করে থাকেন এবং পার্কিং কোম্পানির কোনো আর্থিক ক্ষতি না হয়ে থাকে, তাহলে অতিরিক্ত অর্থের দাবি বৈধ জরিমানা হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে।

আদালতের রায়ের পর জন বলেন, বিচারক তার পক্ষে রায় দেওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। তার দাবি, কোনো ব্যক্তি পার্কিংয়ের জন্য অর্থ পরিশোধ করে থাকলে এবং টিকিটটি তার গাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রমাণ করা গেলে, শুধু রেজিস্ট্রেশন নম্বর সম্পূর্ণভাবে ছাপা না থাকার কারণে তাকে অতিরিক্ত জরিমানা দিতে বাধ্য করা উচিত নয়।

তবে আদালতের রায়ের পরও বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়নি। সিভিল এনফোর্সমেন্টকে ১৪ দিনের মধ্যে জনকে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার ব্যাংক হিসাবে কোনো অর্থ জমা পড়েনি। এরপর জন কোম্পানিকে ই-মেইল করে জানান, অর্থ পরিশোধ না করা হলে তিনি বিষয়টি ব্রিটিশ পার্কিং অ্যাসোসিয়েশনের কাছে জানাবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ক্ষতিপূরণের অর্থ পান। ব্যাংক লেনদেনে অর্থ পাঠানোর প্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে ‘ক্রিয়েটিভ কার পার্ক’ উল্লেখ ছিল।

এই ঘটনার পর জন আর ফোরম্যান সেন্টার কার পার্কে যাননি। এদিকে পার্কিং মেশিনগুলোর কার্যকারিতা উন্নত করারও দাবি উঠেছে। স্থানীয় অনেক গাড়িচালক অভিযোগ করেছেন, পার্কিংয়ের অর্থ পরিশোধের প্রমাণ থাকার পরও জরিমানার শিকার হওয়ায় তারা ওই এলাকায় যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কারণ পার্কিং জরিমানার কারণে শহরে মানুষের যাতায়াত কমে গেলে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ফোরম্যান সেন্টার কার পার্কের জমির মালিকের পক্ষে সম্পত্তি ব্যবস্থাপক হেনরি লয়েড-রবার্টস জানিয়েছেন, তিনি ক্রিয়েটিভ কার পার্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে জন ওয়াটার্সের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করবেন।

সর্বাধিক পঠিত


আরও খবর
ভিডিও