স্বাস্থ্য

ওজন কমানোর নতুন ‘ওষুধ’ অনুমোদন যুক্তরাজ্যে, ইনজেকশনের বদলে প্রতিদিন একটি ট্যাবলেট!

16346_Weight-Loss-Medication.jpeg

স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় যুক্তরাজ্যে অনুমোদন পেয়েছে নতুন একটি দৈনিক ওজন কমানোর ট্যাবলেট। মাউঞ্জারো ইনজেকশনের প্রস্তুতকারক এলি লিলির তৈরি এই ওষুধ ইনজেকশনের বিকল্প হিসেবে ওজন কমানোর চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

যুক্তরাজ্যে ওজন কমানোর জন্য নতুন একটি দৈনিক ওষুধ ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ওষুধটির জেনেরিক নাম অরফোরগ্লিপ্রন। এটি তৈরি করেছে মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এলি লিলি, যারা জনপ্রিয় ওজন কমানোর ইনজেকশন মাউঞ্জারো তৈরি করে। যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা মেডিসিনস অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রোডাক্টস রেগুলেটরি এজেন্সি বা এমএইচআরএ স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ওষুধটির ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে।

অরফোরগ্লিপ্রন জিএলপি-১ ধরনের ওষুধ। এটি ক্ষুধা কমাতে এবং খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, ফলে নিয়মিত ব্যবহারে শরীরের ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে। বর্তমানে মাউঞ্জারো ও ওয়েগোভির মতো জনপ্রিয় জিএলপি-১ ওষুধ মূলত ইনজেকশনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়। নতুন ওষুধটির বিশেষত্ব হলো, এটি প্রতিদিন মুখে খাওয়া যাবে।

তবে যুক্তরাজ্যে অনুমোদন পেলেও এখনই সবাই জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বা এনএইচএসের মাধ্যমে ওষুধটি বিনামূল্যে পাবেন না। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে এটি কেনা যাবে। ওজন কমানোর চিকিৎসায় এনএইচএসের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সেলেন্স বা নাইসের মূল্যায়ন ও সুপারিশ প্রয়োজন হবে।

এলি লিলি জানিয়েছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ওষুধটি এনএইচএসে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও ওজন কমানোর চিকিৎসা হিসেবেও এটি সুপারিশ করার জন্য নাইসের কাছে আবেদন করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অরফোরগ্লিপ্রনের মাধ্যমে ওজন কমানোর মাত্রা কিছু অন্য আধুনিক ওজন কমানোর চিকিৎসার তুলনায় কম হতে পারে। তবে এর ফলে রোগীদের ওজনে উল্লেখযোগ্য এবং চিকিৎসাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। অ্যাংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটির ড. সাইমন কর্কের মতে, নতুন ওষুধটির বড় সুবিধা হতে পারে এর সম্ভাব্য কম খরচ। বর্তমানে এনএইচএসে ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তুলনামূলক কম দামের একটি মুখে খাওয়ার ওষুধ আরও বেশি মানুষের কাছে ওজন কমানোর চিকিৎসা পৌঁছে দিতে পারে।

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাভিদ সাত্তারও নতুন ওষুধের অনুমোদনকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, মুখে খাওয়ার আরেকটি কার্যকর বিকল্প যুক্ত হওয়ায় রোগীরা নিজেদের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী চিকিৎসা বেছে নেওয়ার আরও বেশি সুযোগ পাবেন।

নতুন ওষুধটির আরেকটি সুবিধা হলো এটি দিনের যেকোনো সময়ে খাওয়া যেতে পারে। এর বিপরীতে মুখে খাওয়ার ওয়েগোভি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এবং খালি পেটে গ্রহণ করতে হয়। ফলে দৈনন্দিন জীবনে অরফোরগ্লিপ্রন তুলনামূলকভাবে সহজে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

অরফোরগ্লিপ্রন নিয়ে সবচেয়ে আগ্রহের একটি বিষয় হলো, এটি ওজন কমানোর ইনজেকশন বন্ধ করার পরও ওজন ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে কি না। জিএলপি-১ ধরনের ইনজেকশন বন্ধ করার পর অনেকের হারানো ওজন আবার ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, যারা আগে ওজন কমানোর ইনজেকশন ব্যবহার করেছেন এবং পরে প্রতিদিন অরফোরগ্লিপ্রন গ্রহণ করেছেন, তারা এক বছর পর হারানো ওজনের বড় একটি অংশ ধরে রাখতে পেরেছেন।

তবে ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহার করলেও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার করাও উচিত নয়।

অন্য যেকোনো ওষুধের মতো অরফোরগ্লিপ্রনেরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। এর মধ্যে বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং বমি অন্যতম। কার জন্য ওষুধটি উপযুক্ত, কী মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে এবং কতদিন চালিয়ে যেতে হবে, তা ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর নির্ভর করবে।

যুক্তরাজ্যে নতুন এই ওজন কমানোর ট্যাবলেটের অনুমোদন তাই স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইনজেকশনের পাশাপাশি মুখে খাওয়ার একটি নতুন বিকল্প যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে ওজন নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসা আরও সহজলভ্য হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও