যুক্তরাজ্য

Metro
১১ আগস্ট ২০২৬, ১৪:০৮
আরও খবর

লন্ডনের টিউব স্টেশনে আজ থেকে ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা; নজরদারিতে লাখো যাত্রী!

16355_uyt.jpg

লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ টিউব স্টেশনে আজ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) থেকে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা। অপরাধে জড়িত ‘উচ্চ ঝুঁকির’ ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারে সহায়তা করাই এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মূল লক্ষ্য। তবে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক নজরদারি নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

লন্ডনের পরিবহন ব্যবস্থায় অপরাধ দমনে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল)। এর অংশ হিসেবে আজ থেকে ভিক্টোরিয়া স্টেশনে লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা চালু করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে লন্ডনের আরও গুরুত্বপূর্ণ টিউব স্টেশনে এই প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হবে।

লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে স্টেশনে চলাচলকারী মানুষের মুখের ছবি সরাসরি ধারণ করে তা পুলিশের ওয়াচলিস্টে থাকা ব্যক্তিদের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। যৌন অপরাধ, ডাকাতি, ছুরি-সংক্রান্ত অপরাধসহ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা পুলিশের খোঁজে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। জামিনের শর্ত ভঙ্গ করে পলাতক ব্যক্তিদেরও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।

ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশ (বিটিপি) জানিয়েছে, ক্যামেরায় ধারণ করা কোনো ব্যক্তির মুখ পুলিশের ওয়াচলিস্টের সঙ্গে না মিললে সেই ছবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে মুছে ফেলা হবে।

তবে প্রযুক্তিটির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গোপনীয়তা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। সমালোচকদের অভিযোগ, লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশনের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করার নামে বিপুলসংখ্যক নিরপরাধ মানুষও পুলিশের নজরদারির আওতায় চলে আসতে পারেন।

বিগ ব্রাদার ওয়াচ এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের ব্যাপক নজরদারি সাধারণ মানুষকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। সংগঠনটি লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশনের সম্প্রসারণকে ‘ডিস্টোপিয়ান’ বা উদ্বেগজনক ভবিষ্যৎ-নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছে।

টিউব স্টেশনে যারা এই প্রযুক্তির আওতায় পড়তে চান না, তাদের জন্য বিকল্প পথ রাখার কথা বলা হয়েছে। স্টেশনগুলোতে স্পষ্টভাবে সাইনবোর্ডও থাকবে, যাতে যাত্রীরা ক্যামেরার সামনে দিয়ে যাবেন কি না, সে বিষয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

টিএফএলের নিরাপত্তা, পুলিশিং ও এনফোর্সমেন্ট বিভাগের পরিচালক সিওয়ান হেওয়ার্ড বলেন, প্রত্যেক মানুষের ভয়, হয়রানি, হুমকি বা সহিংসতার আশঙ্কা ছাড়াই যাতায়াতের অধিকার রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন অপরাধ প্রতিরোধ করা তাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

তিনি বলেন, লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন পুলিশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে যৌন অপরাধসহ গুরুতর অপরাধে পুলিশের খোঁজে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে এবং কোনো ঘটনা ঘটার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

লন্ডনে এই প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্য নতুন নয়। ২০১৬ সালে নটিং হিল কার্নিভালে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০২০ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছয় মাসের একটি নতুন পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়, যার প্রাথমিক পর্যায়ে লন্ডন ব্রিজ এলাকায় প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

তবে আগের পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশের ডিপ্লয়মেন্ট লগ অনুযায়ী, ওই কার্যক্রমে ৫ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মুখ স্ক্যান করা হলেও প্রকৃত কোনো ‘ম্যাচ’ পাওয়া যায়নি এবং কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি। বরং অন্তত একটি ক্ষেত্রে ভুল শনাক্তকরণের ঘটনা ঘটেছিল।

এ ধরনের ভুল শনাক্তকরণের ঘটনা এর আগে লন্ডনের এলিফ্যান্ট অ্যান্ড ক্যাসলের একটি সainsbury’s দোকানেও আলোচনায় আসে। ফেসওয়াচ নামের ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবস্থার মাধ্যমে ওয়ারেন রাজাহ নামের এক ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে ভুলভাবে শনাক্ত করা হয়েছিল। তাকে কেনাকাটা বন্ধ করে দোকান থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে সainsbury’s ঘটনাটিকে ‘মানবিক ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করে তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে।

রাজাহ দাবি করেন, প্রযুক্তির পাশাপাশি কর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল শনাক্তকরণের কারণে একজন সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে অপমানিত হওয়ার পাশাপাশি মানসিকভাবে গুরুতর চাপের মধ্যে পড়তে পারেন বলেও তিনি সতর্ক করেন।

বিগ ব্রাদার ওয়াচের পরিচালক সিলকি কার্লো বলেন, লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশনের এমন ব্যাপক ব্যবহার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, এতে লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের মুখ পুলিশের নজরদারির আওতায় চলে আসবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ব্রিটেনে পুলিশ এখন এমনভাবে লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবহার করছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপক নজরদারির পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশের এই প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা চিফ সুপারিনটেনডেন্ট ক্রিস ক্যাসি বলেন, লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনে প্রযুক্তিটির ব্যবহার তাদের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন ধাপ। ভিন্ন ধরনের পরিবহন পরিবেশে প্রযুক্তিটি কীভাবে কাজ করে, তা মূল্যায়নের পাশাপাশি রেল নেটওয়ার্কজুড়ে এর ব্যবহার আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।

বিটিপি জানিয়েছে, টিউব স্টেশনগুলোতে এই ক্যামেরার ব্যবহার হবে ‘গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক’। অর্থাৎ পুলিশের ওয়াচলিস্টে থাকা এবং জামিনের শর্ত ভঙ্গকারীসহ নির্দিষ্টভাবে খোঁজা ব্যক্তিদের শনাক্ত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

লন্ডনের টিউব স্টেশনগুলোতে লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন চালুর ফলে অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা কতটা বাড়ে এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা ও অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকে; এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সর্বাধিক পঠিত


আরও খবর
ভিডিও