
মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে নিযুক্ত নাবিকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৭ জন মার্কিন নৌসেনা নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া যুদ্ধজাহাজটি গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে মোতায়েন ছিল।
তেহরানভিত্তিক বার্তা সংস্থা মেহের (MNA)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনকে কেন্দ্র করে জাহাজটির ক্রুদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল। এর মধ্যেই সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এদিকে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম একটি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ মোতায়েন রাখার প্রতিবাদে ক্রুদের পরিবারের সদস্যদের বিক্ষোভের পর পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) প্রধান ব্র্যাড কুপারের একজন উপদেষ্টা রণতরীটিতে যান।
ওই যুদ্ধজাহাজে কর্মরত সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় ওই উপদেষ্টাকে লক্ষ্য করে দুয়োধ্বনি দেওয়া হয় এবং তার দিকে পানির বোতল ছোড়া হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ক্রু সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে ছুরি ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র ব্যবহৃত হয় বলে ওই সূত্রের দাবি। সংঘর্ষে সাতজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হন।
তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার পরও রণতরীটির ভেতরের পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্থির রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২৬৩ দিন ধরে মোতায়েন রয়েছে এবং বর্তমানে ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছে। সেখানে এর প্রধান মিশন হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে একটি নৌ অবরোধ কার্যকর করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, ওমানের একটি স্বল্প সময়ের বিরতি বাদ দিলে রণতরীটি টানা ২০৮ দিন সমুদ্রে রয়েছে, যা আধুনিক যুগে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর দীর্ঘতম ধারাবাহিক সমুদ্র মোতায়েন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাবিক ও তাদের স্বজনেরা একাধিক ঘটনার কথা জানিয়েছেন। এতে ক্রু সদস্যরা জাহাজ থেকে লাফ দেওয়ার (সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া) চেষ্টা করেছেন বা এমন চিন্তা করেছেন।
এক নাবিকের স্ত্রীর মতে, এ ঘটনায় এক নাবিক তার সহকর্মীকে লাফ দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে দেখে তাকে আটকে দেন।
তবে এসব ঘটনায় কতজন সদস্য সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বা আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছেন—সে বিষয়ে নৌবাহিনী বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেনি।
প্রতিবেদনগুলো বিমানবাহী রণতরীটিতে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা আরও জোরালো করেছে, যা নিজ ঘাটির বাইরে দীর্ঘ সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
নাবিক ও সেনাদের পরিবারগুলো মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, নাবিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার সীমিত সুযোগ, ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং খাদ্য, পানি ও মৌলিক সরবরাহের ঘাটতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
কিছু স্বজন বলেছেন, তাদের প্রিয়জনদের মানসিকভাবে বিধ্বস্ত মনে হচ্ছে এবং তারা দেশে ফেরার একটি তারিখ পাওয়ার জন্য ক্রমশ ব্যাকুল হয়ে উঠছেন।
মূলত এই মিশন নিয়ে সম্প্রতি সান ডিয়েগোতে ২০০ জনেরও বেশি পরিবারের সদস্য জ্যেষ্ঠ নৌ-কর্মকর্তাদের সাথে মুখোমুখি কথা বলেছেন। এ সময় নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং চাও এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য, ক্লান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও অভিযোগ শোনেন।
সারফেস ফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল জোসেফ কাহিল নাবিক ও তাদের পরিবারের উপর সৃষ্ট এই মানসিক ও শারীরিক চাপের কথা স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, নৌ-কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে রণতরীতে কাউন্সিলর, চ্যাপ্লেন (ধর্মীয় উপদেষ্টা), চিকিৎসা কর্মী এবং অন্যান্য সহায়তামূলক সেবা নিয়োজিত রয়েছে।
মার্কিন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এর মিশন প্রাথমিকভাবে মে মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল, তবে কোনো ধরনের বাড়ি ফেরার তারিখ ঘোষণা ছাড়াই তা অব্যাহত রয়েছে।
নৌবাহিনী লিংকনকে স্থলাভিষিক্ত করতে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে প্রস্তুত করছে, যদিও নিরাপত্তা জনিত কারণ দেখিয়ে কর্মকর্তারা সঠিক সময়সীমা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।