
ক্ল্যাকটন উপনির্বাচনে নাইজেল ফারাজের মুখোমুখি ‘কাউন্ট বিনফেস’, কমছে জনপ্রিয়তা, ৫০ লাখ পাউন্ডের অনুদান নিয়ে তদন্তের আশঙ্কা
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় নাইজেল ফারাজ। তবে এবার তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থী নন, বরং রাজনৈতিক ব্যঙ্গের জন্য পরিচিত ‘কাউন্ট বিনফেস’। ক্ল্যাকটনের উপনির্বাচন ঘিরে এমন এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা রিফর্ম ইউকের নেতা ফারাজের জন্য একই সঙ্গে হাস্যকর ও রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর হয়ে উঠেছে।
ক্ল্যাকটনে উপনির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফারাজ নিজেই। ধারণা ছিল, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করবেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে চলা আর্থিক বিতর্কের চাপ কমাতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি তাঁর প্রত্যাশার মতো হয়নি। বরং উপনির্বাচন ঘিরে তাঁর জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ক্ল্যাকটনের নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী না থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাটি আরও অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। ফারাজের অন্যতম আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্ট বিনফেস, যিনি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও অভিনব প্রচারের জন্য পরিচিত। ফলে ব্রিটিশ রাজনীতিতে এই নির্বাচন এখন অনেকটাই রাজনৈতিক নাটকে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ফারাজের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে আছে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায়ী ক্রিস্টোফার হারবর্নের কাছ থেকে পাওয়া ৫০ লাখ পাউন্ডের আর্থিক সহায়তা নিয়ে বিতর্ক। এই অর্থ তিনি যথাযথভাবে ঘোষণা করেছিলেন কি না, তা নিয়ে পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনারের তদন্তের মুখে পড়েছেন তিনি।
ফারাজ দাবি করেছেন, ওই অর্থ প্রকাশ করার প্রয়োজন ছিল না। তবে পার্লামেন্টে প্রবেশের আগের ১২ মাসে পাওয়া রাজনৈতিক অনুদান ও উপহার প্রকাশের নিয়ম নিয়ে তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থ নিয়ে প্রশ্নের মুখে এক পর্যায়ে ফারাজ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, এটি কারও জানার বিষয় নয়। এমনকি তিনি চাইলে ওই অর্থ দিয়ে ফেরারি গাড়ি কিনতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন।
উপনির্বাচনে ফারাজ জয়ী হলেও এই তদন্ত থেকে তিনি মুক্তি পাবেন না। বরং জয়ী হলে তদন্ত আবারও এগিয়ে যেতে পারে। নিয়ম ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি পরিস্থিতি গুরুতর হলে ভবিষ্যতে আরেকটি উপনির্বাচনের প্রয়োজনও হতে পারে।
এদিকে ফারাজের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী বিশ্লেষক স্যার জন কার্টিসের মতে, ক্ল্যাকটনে উপনির্বাচন ডাকার সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত রিফর্ম ইউকের জন্য প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনেনি। বরং দলটির কিছুটা ক্ষতি হয়েছে এবং ফারাজের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও কমেছে।
বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী না থাকায় জাতীয় পর্যায়ে ফারাজের গণমাধ্যমে উপস্থিতিও কমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, টেলিভিশন বিতর্ক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে তাঁকে হাজির করলেও বিপরীতে বড় দলের প্রার্থী না থাকায় সেই আলোচনা আগের মতো আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে না।
ফারাজের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে লেবার পার্টির নতুন নেতৃত্ব। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের বিভিন্ন নীতির কারণে লেবার আবারও জনমত জরিপে রিফর্ম ইউকের চেয়ে এগিয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বার্নহাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বাসভাড়া সীমিত করা, জ্বালানি বিল কমানোর উদ্যোগ এবং পাব ও আতিথেয়তা খাতের জন্য করের চাপ কমানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারকে আরও ক্ষমতা দেওয়ার জন্য বড় ধরনের ডিভল্যুশন পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি।
এ ছাড়া গৃহহীনতা কমানো, সামাজিক পরিচর্যা ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজেদের এলাকায় নতুন ব্যবসা ও দোকান স্থাপনের বিষয়ে আরও বেশি মতামত দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
অন্যদিকে ফারাজের অভিবাসন নীতির বেশ কিছু প্রস্তাবও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিবাসীদের বহনকারী নৌকা নৌবাহিনী ব্যবহার করে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে ফ্রান্সের আপত্তি রয়েছে। ফারাজ বিদেশি অপরাধীদের এল সালভাদরে পাঠানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন, যা লেবার পার্টি বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে দাবি করেছে।
সবকিছুর পরও ক্ল্যাকটন উপনির্বাচনে ফারাজই জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার। কিন্তু ভোটে জয় পেলেই তাঁর রাজনৈতিক সমস্যা শেষ হচ্ছে না। বরং জয়ী হলে ৫০ লাখ পাউন্ডের অনুদান নিয়ে তদন্ত এবং তাঁর আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে।
লেবার পার্টির চেয়ার ব্রিজেট ফিলিপসন ইতোমধ্যে এই উপনির্বাচনকে কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘বিন ডে’ থেকে একমাত্র যে বিষয়টি জানা যাবে, তা হলো নাইজেল ফারাজ ক্ল্যাকটনের মানুষের সময় নষ্ট করতে পারেন।
তাই ক্ল্যাকটনের ভোটের ফল শুধু একটি আসনের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে না। এটি নাইজেল ফারাজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, রিফর্ম ইউকের জনপ্রিয়তা এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অভিযোগের ভবিষ্যৎ গতিপথের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।