
রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ আবারও ক্ল্যাকটনের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। উপনির্বাচনে তিনি ২২ হাজার ২৩৯ ভোট পেয়ে ৬২ দশমিক ৮২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যঙ্গাত্মক প্রার্থী কাউন্ট বিনফেস পান ৯ হাজার ৪৫৫ ভোট, অর্থাৎ ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে বড় ব্যবধানে জয় পাওয়ার পরও ভোট গণনাকেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন না ফারাজ।
এই উপনির্বাচনের সূত্রপাত হয় ফারাজের এমপি পদ থেকে পদত্যাগের পর। গত ৭ জুলাই তিনি পদত্যাগ করে উপনির্বাচনের ডাক দেন। তাঁর দাবি ছিল, গণমাধ্যমের তীব্র নজরদারি এবং পার্লামেন্টারি তদন্তের প্রতিবাদেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফারাজ চেয়েছিলেন নির্বাচনটি ‘জনগণ বনাম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের’ লড়াই হিসেবে সামনে আসুক। তবে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচনে প্রার্থী দেয়নি এবং এটিকে ফারাজের একটি রাজনৈতিক ‘স্টান্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।
এবারের নির্বাচনে মোট ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মূলধারার দলগুলোর অনুপস্থিতিতে ফারাজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন কমেডিয়ান জোনাথন হার্ভে অভিনীত কাউন্ট বিনফেস। শেষ পর্যন্ত ফারাজ তাঁর চেয়ে ১২ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয় পান।
তবে ভোট গণনার সময় ফারাজের অনুপস্থিতি নিয়ে আলাদা করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভোর ৩টার দিকে তিনি ঘোষণা করেন, এসেক্স পুলিশের কাছ থেকে তিনি ভোট গণনার ফলাফল ‘ব্যাহত ও নষ্ট করার জন্য একটি সংগঠিত প্রচারণা’র তথ্য পেয়েছেন। এ কারণে তিনি গণনাকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফারাজ বলেন, তিনি ‘কেউ নয় এমন ব্যক্তিদের’ হাতে অপমানিত বা হেয় হতে চান না। রিফর্ম ইউকের পক্ষ থেকেও তাঁর বিরুদ্ধে একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য হুমকি’ থাকার দাবি করা হয়।
তবে এসেক্স পুলিশ ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছে। স্কাই নিউজের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ কোনো প্রার্থীকে ক্ল্যাকটন উপনির্বাচনের ভোট গণনায় উপস্থিত না থাকতে পরামর্শ দেয়নি। কাউন্সিলের রিটার্নিং অফিসারও গণনাকেন্দ্রকে নিরাপদ বলে মনে করেছিলেন। রিফর্ম ইউকের ডেপুটি নেতা রিচার্ড টাইস অবশ্য ফারাজকে ঘিরে নিরাপত্তা হুমকির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, নিরাপত্তা দলের কাছে বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে এবং সেই তথ্য প্রকাশ করলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জয় নিশ্চিত হওয়ার পর ফারাজ লিখিত বিবৃতিতে বলেন, ক্ল্যাকটনের ভোটাররা ‘পুরো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে’ নিজেদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় এবার তিনি এক হাজারেরও বেশি ভোট বেশি পেয়েছেন। রিফর্ম ইউকে এই ফলাফলকে দলের নেতা ও তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি ভোটারদের সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে।
কিন্তু নির্বাচনে জয় পাওয়ার পরও ফারাজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক শেষ হচ্ছে না। কারণ, তাঁর বিরুদ্ধে পার্লামেন্টারি তদন্ত আবারও শুরু হয়েছে। তদন্তটি মূলত ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে পাওয়া £৫ মিলিয়ন অর্থের একটি উপহার ঘোষণা না করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে।
পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনার ড্যানিয়েল গ্রিনবার্গ গত মে মাসে তদন্ত শুরু করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, থাইল্যান্ডভিত্তিক ধনকুবের ক্রিস্টোফার হারবোর্ন ফারাজকে £৫ মিলিয়ন উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু এমপি হওয়ার আগে পাওয়া এই অর্থ পার্লামেন্টারি নিয়ম অনুযায়ী ঘোষণা করা হয়নি।
ফারাজ অবশ্য কোনো নিয়ম ভঙ্গ করার কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, অর্থটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য দেওয়া হয়েছিল। পার্লামেন্টারি নিয়মে ব্যক্তিগত উপহারের ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম থাকায় তিনি মনে করেন, এই অর্থ ঘোষণা করার বাধ্যবাধকতা ছিল না।
তবে ক্রিস্টোফার হারবোর্নের একটি মন্তব্য সেই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তিনি এপ্রিল মাসে দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছিলেন, ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে কয়েক দশকের কাজের প্রতি তাঁর ‘গভীর প্রশংসা’র কারণে তিনি ফারাজকে অর্থ দিয়েছিলেন।
এরপর ফারাজের আর্থিক বিষয় নিয়ে আরও প্রশ্ন ওঠে। স্কাই নিউজের তথ্য অনুযায়ী, £৫ মিলিয়ন পাওয়ার কিছুদিন পর, ২০২৪ সালের মে মাসে ফারাজ নগদ অর্থে প্রায় £১ দশমিক ৪ মিলিয়ন মূল্যের একটি বাড়ি কেনেন। তবে রিফর্ম ইউকে দাবি করেছে, বাড়িটি কেনার অর্থ ওই £৫ মিলিয়নের উপহার থেকে নেওয়া হয়নি।
ফারাজ এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করার পর তাঁর বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর সেই স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত আবার শুরু হয়েছে। তদন্ত শেষে স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনার যদি মনে করেন ফারাজ নিয়ম ভঙ্গ করেছেন, তাহলে বিষয়টি পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডার্ডস কমিটির কাছে পাঠানো হতে পারে।
ফারাজের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে ১০ দিনের বেশি সময়ের জন্য পার্লামেন্ট থেকে সাসপেন্ড হওয়া। এমন শাস্তি হলে ক্ল্যাকটনে একটি রিকল পিটিশন শুরু হতে পারে। আসনের মোট যোগ্য ভোটারের অন্তত ১০ শতাংশ এই পিটিশনে স্বাক্ষর করলে ফারাজকে এমপি পদ থেকে প্রত্যাহার করে নতুন উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ক্ল্যাকটনে নিবন্ধিত ভোটার প্রায় ৭৯ হাজার ৭৮৫ জন। অর্থাৎ রিকল পিটিশনের মাধ্যমে নতুন উপনির্বাচন ডাকতে প্রয়োজন হবে প্রায় ৭ হাজার ৯৭৯টি স্বাক্ষর। এবারের উপনির্বাচনে কাউন্ট বিনফেস ৯ হাজার ৪৫৫ ভোট পেয়েছেন, যা এই প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়েও বেশি। ফলে ফারাজের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে রিকল পিটিশন হলে পর্যাপ্ত সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফারাজের বিরুদ্ধে তদন্তের কেন্দ্রে থাকা ক্রিস্টোফার হারবোর্ন থাইল্যান্ডভিত্তিক একজন ক্রিপ্টো ব্যবসায়ী ও ধনকুবের এবং রিফর্ম ইউকের অন্যতম বড় আর্থিক সমর্থক। ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি রিফর্ম ইউকেকে £৯ মিলিয়ন দান করেন, যা যুক্তরাজ্যে জীবিত কোনো ব্যক্তির দেওয়া সবচেয়ে বড় একক রাজনৈতিক অনুদান হিসেবে রেকর্ড তৈরি করে। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ফারাজকে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া £৫ মিলিয়ন উপহারই এখন পার্লামেন্টারি তদন্তের মূল বিষয়।
ফারাজের পুনর্নির্বাচনের পর তদন্ত পুনরায় শুরু হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন কনজারভেটিভ পার্টির চেয়ারম্যান কেভিন হলিনরেক। তাঁর মতে, বিষয়টি তুচ্ছ নয়, কারণ এখানে £৫ মিলিয়নের প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, পার্লামেন্টারি নিয়ম শুধু কোনো এমপি যাতে ব্যক্তিগতভাবে অর্থবান না হয়ে ওঠেন তা নিশ্চিত করার জন্য নয়; বরং কোনো উপহার বা আর্থিক সহায়তা যাতে একজন রাজনীতিকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
হলিনরেক বলেন, ফারাজের নিজের নির্দোষ দাবি করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, কিন্তু তিনি তদন্ত এড়িয়ে যেতে পারেন না। ভবিষ্যতে যদি এই অভিযোগের কারণে আবার উপনির্বাচন হয়, তাহলে কনজারভেটিভ পার্টি সেখানে প্রার্থী দেবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন।
ফলে ক্ল্যাকটনে নাইজেল ফারাজের বড় জয় আপাতত রিফর্ম ইউকের জন্য রাজনৈতিক স্বস্তি এনে দিলেও, তাঁর বিরুদ্ধে চলমান £৫ মিলিয়নের তদন্ত নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তদন্তে যদি নিয়ম ভঙ্গের প্রমাণ মেলে এবং ফারাজের বিরুদ্ধে ১০ দিনের বেশি সাসপেনশনের মতো কঠোর শাস্তি হয়, তাহলে ক্ল্যাকটনে আবারও উপনির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।