
পূর্ব ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে অবস্থানরত রুশ সেনারা যখন আরেকটি শীতকাল মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তারা এক অভিনব সহায়তা পাচ্ছে: ছয় শতাব্দিরও বেশি সময় আগে মস্কোর হয়ে যুদ্ধ করা এক বীর রাজপুত্রের দেহাবশেষ। ১৩৮০ সালে কুলিকোভোর যুদ্ধে জয়ের জন্য রাশিয়ায় অত্যন্ত সম্মানিত রাজপুত্র দিমিত্রি দনস্কয়ের দেহাবশেষের একটি অংশ সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়েছিল; বর্তমানে সেটি রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
রুশ অর্থোডক্স চার্চের ধর্মীয় নেতৃত্বের কেন্দ্র ‘মস্কো প্যাট্রিয়ার্কেট’-এর সামরিক বিভাগ জানিয়েছে, এই ‘সন্ত-সেনাপতি’ অদৃশ্যভাবে রুশ সেনাদের ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ পাশে দাঁড়াবেন। পবিত্র এই অবশিষ্টাংশটি তার ডান হাতের একটি অংশ—অর্থাৎ সেই হাতটিই, যা দিয়ে তিনি কুলিকোভোর যুদ্ধে তলোয়ার চালিয়েছিলেন।
যুদ্ধের ময়দানে কোনো ধর্মীয় পবিত্র নিদর্শন পাঠানো অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে রাশিয়া এমন এক দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে যেখানে তারা নিজেদের অবস্থানকে ‘ন্যায্য’ ও ‘ঐশ্বরিক অনুমোদনপ্রাপ্ত’ হিসেবে তুলে ধরতে ধর্মীয় প্রতীকী বিষয়সহ সম্ভাব্য সব উপায় কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে, ক্রেমলিন ও রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের মধ্যকার সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটির অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ান স্টাডিজ সেন্টারের যোগাযোগ বিষয়ক পরিচালক ও ধর্মবিষয়ক গবেষক সের্গেই চাপনিন বলেন, “চার্চ ও রাষ্ট্র কার্যত একে অপরের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে তাদের মধ্যে আর কোনো পার্থক্য করা কঠিন। আমার দৃষ্টিতে, এই ঘনিষ্ঠতা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।” সেনাবাহিনীর কাছে পবিত্র ধর্মীয় নিদর্শন বা ‘রেলিক’ পাঠানো অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্মে দীর্ঘদিনের একটি প্রথা। মস্কো প্যাট্রিয়ার্কেটের প্রকাশনা সংস্থায় কর্মরত থাকা চাপনিন বলেন, “পবিত্রতা ও পার্থিব বিষয়ের এই সংমিশ্রণটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আর স্বাভাবিকভাবেই, প্রচারণার কাজে এর ব্যবহার করা হয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দনস্কয়ের দেহাবশেষ সমসাময়িক একটি বার্তাও বহন করে। ওই গবেষক সিএনএন-কে বলেন, “তিনি নিজে কোনো আগ্রাসী ছিলেন না, বরং ছিলেন মাতৃভূমির রক্ষক। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে রাশিয়া কোনো আগ্রাসী শক্তি নয়, বরং আমরা আমাদের ভূখণ্ড রক্ষা করছি।” চাপনিন বিষয়টিকে ‘জনগণকে উদ্বুদ্ধকারী এক মিথ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “বিভিন্ন সময় ও যুগকে সংযোগকারী এই মিথগুলো গণমানসে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে।”
ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়া যে সকল ‘যোদ্ধা-সন্ত’ বা ধর্মপ্রাণ যোদ্ধার শরণাপন্ন হয়েছে, দনস্কয় তাদের মধ্যে প্রথম নন। রুশ সামরিক গৌরবের প্রতীক ও মধ্যযুগীয় শাসক প্রিন্স আলেকজান্ডার নেভস্কির দেহাবশেষও চলতি বছরের শুরুর দিকে সেনাদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে দনস্কয়ের দেহাবশেষ পাঠানোর সময়টিও ছিল বেশ সুবিধাজনক। নেভস্কির দেহাবশেষ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে যখন বিভিন্ন অনিশ্চিত খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, তার কয়েক সপ্তাহ পরেই—আগস্ট মাসে ক্রেমলিনের আর্চএঞ্জেল ক্যাথেড্রালে সংস্কারকাজ চালানোর সময় এই প্রিন্সের দেহাবশেষটি খুঁজে পাওয়া যায়।