
যুক্তরাজ্যের সড়কে হাজার হাজার অবৈধ গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত হয়েছে নতুন এক ক্যামেরা ব্যবস্থায়। দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের মোটরওয়েতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা এই প্রযুক্তি এমন নম্বরপ্লেটও শনাক্ত করতে পারছে, যেগুলো স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ বা এএনপিআর (ANPR) ক্যামেরার চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য পরিবর্তন করা হয়েছে।
বিবিসি প্যানোরামার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কিছু গাড়িচালক ইচ্ছাকৃতভাবে এমন নম্বরপ্লেট ব্যবহার করছেন, যা স্পিড লিমিট, লো-এমিশন জোনের নিয়ম প্রয়োগ এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে ব্যবহৃত এএনপিআর ক্যামেরায় সঠিকভাবে ধরা পড়ে না। এ ধরনের নম্বরপ্লেট নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়ছে।
যুক্তরাজ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এএনপিআর ক্যামেরা নেটওয়ার্ক রয়েছে। প্রায় ১৪ হাজার স্থানে থাকা ক্যামেরাগুলো প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যামেরার প্রযুক্তিকে এড়িয়ে যাওয়ার বিভিন্ন কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন।
অবৈধ নম্বরপ্লেটের মধ্যে রয়েছে ক্লোনড প্লেট এবং তথাকথিত ‘ঘোস্ট প্লেট’। ক্লোনড প্লেটে অন্য একটি বৈধ গাড়ির একই রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করা হয়। ফলে অপরাধ বা ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে পুলিশের কাছে ভুল গাড়ির তথ্য চলে যেতে পারে। অন্যদিকে ঘোস্ট প্লেটে বিশেষ ধরনের প্রতিফলক উপাদান ব্যবহার করা হয়, যার কারণে অধিকাংশ এএনপিআর ক্যামেরা নম্বরের পুরোটা বা কোনো কোনো অংশ পড়তে পারে না।
এএনপিআর প্রযুক্তির অন্যতম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমএভি সিস্টেমস এমন একটি নতুন ক্যামেরা পরীক্ষা করছে, যা ঘোস্ট প্লেট শনাক্ত করতে সক্ষম। লন্ডনের বাইরে ডার্টফোর্ড ক্রসিংয়ের কাছে একটি পরীক্ষামূলক স্থানে কয়েক মাস ধরে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি ঘোস্ট প্লেট শনাক্ত হয়েছে।
এম২৫-এর কাছে আরও একটি পরীক্ষামূলক স্থানে ঘোস্ট প্লেট শনাক্তের সংখ্যা প্রতিদিন প্রায় এক হাজার থেকে বেড়ে প্রায় দুই হাজারে পৌঁছেছে। ফোকস্টোনে ইউরোটানেলের কাছাকাছি আরেকটি স্থানে প্রতিদিন ৪০০টির বেশি সন্দেহজনক নম্বরপ্লেট শনাক্ত হচ্ছে।
অবৈধ নম্বরপ্লেট ব্যবহারের সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনাও সামনে এসেছে। ২০২৩ সালে বাকিংহামশায়ারে জেসন ওয়ালিস নামে এক ব্যক্তি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন। দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরেক মোটরসাইকেল আরোহী পরে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানোর দায়ে কারাদণ্ড পান এবং আদালতে স্বীকার করেন যে তিনি নিজের নম্বরপ্লেট আড়াল করার একটি ডিভাইস ব্যবহার করেছিলেন।
২০২৫ সালে ৮১ বছর বয়সী গ্রাহাম স্লিন একটি পথচারী পারাপারের স্থানে ক্লোনড নম্বরপ্লেট ব্যবহার করা একটি গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন। গাড়িটির ২০ বছর বয়সী চালক কেইন বাইর্নের কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ইনস্যুরেন্স ছিল না। দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগে তিনি নাইট্রাস অক্সাইড গ্রহণ করেছিলেন বলেও আদালতে উঠে আসে। পুলিশ কয়েক ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাকে শনাক্ত করে। একটি ক্যামেরায় দুর্ঘটনার আগে তার গাড়িতে অবৈধ নম্বরপ্লেট লাগানোর দৃশ্যও ধরা পড়ে। পরে তাকে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটানোসহ বিভিন্ন অপরাধে ১১ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সাবেক জ্যেষ্ঠ সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তা এবং সরকারি নজরদারি ক্যামেরাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা টনি পোর্টারের মতে, ক্লোনড ও ঘোস্ট প্লেট পুলিশের অপরাধী শনাক্ত ও অনুসরণ করার সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। তার মতে, এএনপিআর ব্যবস্থায় এমন কোনো দুর্বলতা থাকা উচিত নয়, যা জননিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
যুক্তরাজ্যে বর্তমানে ড্রাইভার অ্যান্ড ভেহিকল লাইসেন্সিং এজেন্সি বা ডিভিএলএতে ৩৪ হাজারের বেশি নম্বরপ্লেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নম্বরপ্লেট সরবরাহকারী হিসেবে নিবন্ধিত হতে একটি ফর্ম পূরণ এবং এককালীন ফি পরিশোধ করাই যথেষ্ট। তবে প্যানোরামার গোপন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু ব্যবসা প্রয়োজনীয় যাচাই ছাড়াই অবৈধ ধরনের নম্বরপ্লেট বিক্রি করছে।
এসেক্সের একটি বাজারে গোপনে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, তিনটি ব্যবসার মধ্যে দুটি এমন ঘোস্ট প্লেট দেওয়ার প্রস্তাব করেছে, যা লন্ডনের আল্ট্রা লো এমিশন জোন বা ইউলেজ (ULEZ) ক্যামেরা এড়িয়ে চলতে সহায়তা করতে পারে। একটি ব্যবসা কোনো পরিচয়পত্র বা ওই রেজিস্ট্রেশন ব্যবহারের অনুমোদনের প্রমাণ ছাড়াই ৪০ পাউন্ডের বিনিময়ে মাত্র আট মিনিটে একটি নম্বরপ্লেট তৈরি করে দেয়।
ঘোস্ট প্লেট কেনা নিজে বেআইনি নয়। তবে সেটি কোনো গাড়িতে লাগিয়ে সড়কে চালানো আইনবিরুদ্ধ।
প্যানোরামার তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২০ সাল থেকে মাত্র দুটি নম্বরপ্লেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে আইন লঙ্ঘনের কারণে বিচারের মুখোমুখি করে ডিভিএলএর নিবন্ধন তালিকা থেকে সরানো হয়েছে। অথচ যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত হাজার হাজার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র ছয়জন ডিভিএলএ কর্মকর্তা।
ডিভিএলএ জানিয়েছে, তারা নিবন্ধিত সরবরাহকারীদের তালিকা পর্যালোচনা করছে, নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা জোরদার করছে এবং আইন ভঙ্গকারী সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ ও ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্ডসের সঙ্গে কাজ করছে।
এদিকে পুলিশ ও ডিভিএলএ যৌথভাবে পরিচালিত এক অভিযানে একটি ভ্যানে ঘোস্ট প্লেট শনাক্ত করা হয়। বিশেষ ইনফ্রারেড গগলস ব্যবহার করে পুলিশ নম্বরপ্লেটটি শনাক্ত করে, যা সাধারণ মানুষের চোখে বৈধ প্লেটের মতোই দেখাচ্ছিল। চালককে ১০০ পাউন্ড জরিমানা করা হয়। তবে তিনি দাবি করেন, প্লেটটি যে অবৈধ তা তিনি জানতেন না।
যুক্তরাজ্যে এএনপিআর ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা চিফ কনস্টেবল টিম ফরবার বলেছেন, ক্লোনড প্লেট ব্যবহার করে গুরুতর ও সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের উদাহরণ প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সামনে আসে। পুলিশ নম্বরপ্লেট সরবরাহকারীদের লাইসেন্সিং ও নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের যানবাহন নিবন্ধনবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জাস্টিন ম্যাডার্স জানিয়েছেন, সরকার সমস্যাটির ব্যাপকতা বুঝতে এবং অবৈধ নম্বরপ্লেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে একটি জাতীয় কেন্দ্র গড়ে তুলছে। সেখানে বিভিন্ন পুলিশ বাহিনীর মধ্যে তথ্য বিনিময়, নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার এবং সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সংগঠিত অপরাধ ও জরিমানা এড়াতে নম্বরপ্লেট ব্যবহারের বিষয়েও নজর দেওয়া হবে।
সরকারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে অবৈধ নম্বরপ্লেটের ব্যবহার কতটা বিস্তৃত এবং তা নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের আরও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।