
মাত্র ৬০ পাউন্ডের একটি পার্কিং টিকিটের বিরোধ গড়িয়েছে দুইটি আদালতের রায়ে, আর এর জেরে ঘর হারিয়ে কয়েক মাস দুই দেশে আলাদা থাকতে হয়েছে লন্ডনের এক পরিবারকে। স্ট্র্যাটফোর্ডের ২৯ বছর বয়সী প্রাইভেট হায়ার ও উবার চালক জিহান জাফার দাবি করেছেন, তিনি কখনো চালাননি এমন একটি গাড়ির পার্কিং চার্জের দায় তার ওপর চাপানো হয়েছিল।
ঘটনার শুরু ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে। ওই সময় একটি গাড়ির জন্য ৬০ পাউন্ডের পার্কিং চার্জ দেওয়া হতো। পরে জিহানের কাছে ১৭০ পাউন্ডের দাবি আসে এবং একপর্যায়ে তা বেড়ে ২৮৫ পাউন্ডে পৌঁছায়। জিহান অভিযোগটি অস্বীকার করেন এবং ডিভিএলএ থেকে লিখিত প্রমাণ সংগ্রহ করেন যে, সংশ্লিষ্ট গাড়িটির নিবন্ধিত মালিক তিনি নন। সেই নথিও তিনি পার্কিং কোম্পানির কাছে জমা দেন।
তবে বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি। পরবর্তীতে জিহানের নামে একটি কাউন্টি কোর্ট জাজমেন্ট বা সিসিজে নথিভুক্ত হয়। বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করতে আদালতের কাছে রায় বাতিলের আবেদন করার জন্য তাকে ৩১৩ পাউন্ড দিতে হয়। সিটিজেন্স অ্যাডভাইসের পরামর্শ নিয়ে তিনি নিজেই আদালতে নিজের পক্ষে অবস্থান নেন।
আদালতে হাজির হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে জিহান এমন নথি পান, যেখানে দেখা যায় অন্য এক ব্যক্তি তাকে ওই গাড়িটির চালক হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন। পরে প্রথম সিসিজেটি বাতিল করা হয়। কিন্তু এরপর জিহান জানতে পারেন, একই গাড়ি ও একই এলাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি পার্কিং চার্জের ঘটনায় তার নামে দ্বিতীয় একটি সিসিজেও নথিভুক্ত হয়েছে। জিহানের দাবি, দ্বিতীয় ঘটনাতেও একই ব্যক্তি তার তথ্য ব্যবহার করে তাকে চালক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
এরপর বিষয়টি তার পরিবারের বাসস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্ট্র্যাটফোর্ডে তাদের বাসার ভাড়ার চুক্তি নবায়নের সময় জিহান জানতে পারেন, বাড়ির মালিকরা চুক্তি নবায়নে আগ্রহী থাকলেও ভাড়া সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের ইন্সুরেন্স কোম্পানি তার ক্রেডিট ফাইলে থাকা সিসিজের কারণে কভার দিতে রাজি হয়নি। ২০ অক্টোবর পরিবারটি তাদের বাসা হারায়।
জিহান বলেন, তখনই তার কাছে বিষয়টি আর শুধু পার্কিং চার্জ বা ক্রেডিটের সমস্যা বলে মনে হয়নি। এটি তার পরিবারের থাকার মতো একটি বাড়ি থাকবে কি না, সেই প্রশ্নে পরিণত হয়েছিল।
পরিবারের একসঙ্গে থাকার মতো নিরাপদ বাসস্থান না থাকায় জিহানের স্ত্রী ও ছোট ছেলে বুলগেরিয়ায় ফিরে যান। জিহান লন্ডনে এক বন্ধুর বাসায় থেকে উবার চালানোর কাজ চালিয়ে যান এবং পরিবারের খরচ চালানোর চেষ্টা করেন। স্ত্রী ও সন্তানের কাছ থেকে দূরে থাকার সময়টিকে তিনি পুরো ঘটনার সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
পরবর্তীতে পরিবারটি আবার একত্রিত হয়েছে এবং বর্তমানে জিহানের শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সঙ্গে থাকছে। তবে নিজেদের স্থায়ী ও নিরাপদ বাসস্থান এখনও হয়নি। এদিকে দ্বিতীয় সিসিজে নিয়ে সমঝোতা এবং বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য একটি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করা হলেও, জিহানের দাবি, দ্বিতীয় সিসিজেটি এখনও তার ক্রেডিট ফাইলে দেখা যাচ্ছে।
জিহানের অভিজ্ঞতা নিয়ে ক্রেডিট তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান চেকমাইফাইলের ব্র্যান্ড ও কমিউনিকেশনস এক্সিকিউটিভ ড্যান অ্যাস্টন বলেন, এই ঘটনা দেখায় ক্রেডিট ফাইলে থাকা তথ্যের প্রভাব শুধু ঋণ বা আর্থিক পণ্য পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সিসিজে থাকলে বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তিনি মানুষকে নিয়মিত নিজেদের ক্রেডিট রিপোর্ট পরীক্ষা করার এবং সেখানে অপরিচিত কোনো তথ্য থাকলে দ্রুত তা যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন। কোনো ঋণ বা আদালতের নোটিশ নিজের বলে মনে না হলে সেটি উপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ, বিষয়টি চ্যালেঞ্জ এবং যত দ্রুত সম্ভব উপযুক্ত পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
মাত্র ৬০ পাউন্ডের একটি পার্কিং চার্জ নিয়ে শুরু হওয়া জিহানের এই বিরোধ এরই মধ্যে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এর মধ্যে রয়েছে দুটি সিসিজে, আদালত ও পার্কিং সংক্রান্ত কয়েকশ পাউন্ডের খরচ এবং সবচেয়ে বড় পরিণতি হিসেবে স্ত্রী ও ছোট সন্তানের কাছ থেকে কয়েক মাস আলাদা থাকার অভিজ্ঞতা।