আন্তর্জাতিক

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, গ্রেপ্তার ৬ হাজারের বেশি

17155_IMG_0906.jpeg

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ ফ্রান্সজুড়ে বড় আকার ধারণ করেছে। স্কুলের অবকাঠামোর দুরবস্থা, শিক্ষক সংকট ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংখ্যার প্রতিবাদে হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক রাজপথে নেমেছেন। বিভিন্ন শহরে উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করা হয়েছে। কোথাও বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও স্ট্রাসবুর্গ, লিয়ন ও রেন শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে এবং পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসের উপকণ্ঠের কয়েকটি এলাকায় শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবারের কর্মসূচিকে এখন পর্যন্ত বিক্ষোভের সবচেয়ে বড় দিন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কেন রাজপথে শিক্ষার্থীরা?

বিক্ষোভকারীদের প্রধান অভিযোগ, ফ্রান্সের প্রায় ৩ হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের অনেকগুলোতেই পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই এবং ভবনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। কোথাও পানির লিকেজ, কোথাও ইঁদুরের উপদ্রবসহ বিভিন্ন সমস্যার কথাও জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

হাইস্কুল শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, দেশের অর্ধেকেরও বেশি উচ্চবিদ্যালয় মঙ্গলবার অবরোধ করা হয়েছে অথবা দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। কিছু এলাকায় কর্তৃপক্ষ অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগও নেয়।

এপি জানিয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী মঙ্গলবার ৮৯১টি স্কুলে ক্লাস পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ ছিল।

সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস ও ব্যাপক গ্রেপ্তার

বিক্ষোভের কিছু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্ট্রাসবুর্গ, লিয়ন ও রেনে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় আগুন জ্বালান ও পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর থেকে ৬ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। দেশটির বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে; তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের হিসাবে, সংঘর্ষে অন্তত ৭১৫ পুলিশ সদস্য ও ২১৫ কিশোর আহত হয়েছেন। সোমবার (৫ অক্টোবর) উত্তর ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় একটি পুলিশি ডিসপার্সাল গ্রেনেড হাতে তুলে নেওয়ার পর ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত ও হাতের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

পুলিশের ব্যবহৃত শক্তি নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা রয়েছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, আন্দোলনের কিছু অংশ বাইরের লোকজনের প্রভাবে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়েছে।

সরকারের প্রতিক্রিয়া

আন্দোলনের চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো নিয়ে কাজ করতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন। অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প শিক্ষক দিয়ে পূরণ, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ ক্লাসসূচি পর্যালোচনা এবং পুরোনো স্কুল ভবনগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে সরকার। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এসব বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তাব দিতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানাতে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। সেখানে তারা স্কুলের সমস্যা ও কী ধরনের পরিবর্তন চায়, তা বেনামে জানাতে পারছে।

বিক্ষোভের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকটও জড়াচ্ছে

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এমন এক সময়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যখন ফ্রান্সের সরকার বড় বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপ সামলানোর চেষ্টা করছে। সরকারি ব্যয় কমানোর চাপের পাশাপাশি দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় দেশটির বন্ডবাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার সাময়িকভাবে ৫ শতাংশের ওপরে উঠে ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। মঙ্গলবার তা কমে প্রায় ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে আসে।

লে পেনের বড় ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা

এই অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী মেরিন লে পেন মঙ্গলবার সরকারি ব্যয় আরও বড় পরিসরে কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, লে পেন ক্ষমতায় এলে ২০২৬ সালের তুলনায় ২০৩২ সালের মধ্যে ১৪০ বিলিয়ন ইউরো নিট সাশ্রয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এর আগে তিনি পাঁচ বছরের মেয়াদে ১২৫ বিলিয়ন ইউরো সাশ্রয়ের পরিকল্পনা জানিয়েছিলেন।

তার পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে বাজেট ঘাটতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত ৩ শতাংশ সীমায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে ফ্রান্সের ঘাটতি চলতি বছরে অর্থনীতির আকারের ৫ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়াবে বলে তার হিসাব।

লে পেন আরও বলেছেন, সংবিধানে আর্থিক শৃঙ্খলার একটি ‘গোল্ডেন রুল’ যুক্ত করতে গণভোট আয়োজন করা হতে পারে। এতে প্রতিবছর বাজেট ঘাটতি অন্তত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট করে কমিয়ে জাতীয় ঋণকে দীর্ঘমেয়াদে জিডিপির ৬০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য থাকবে।

তার ঘোষণার পর ফ্রান্সের বন্ডবাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা যায়। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের বিস্তারিত উপায় এখনও স্পষ্ট নয়।

নির্বাচনের আগে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ

ফ্রান্সের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও সরকারি অর্থব্যবস্থার সংকট এখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে আগামী নির্বাচনের আগে শিক্ষা, সরকারি ব্যয়, ঋণ ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।

এদিকে আন্দোলনের পেছনে বামপন্থী ফ্রান্স আনবুয়েড (LFI)-এর নেতাদের ভূমিকা রয়েছে বলে সরকার ও লে পেনের ন্যাশনাল র‌্যালি অভিযোগ করেছে। দলটি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ফলে স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন শিক্ষা খাতের সীমা ছাড়িয়ে ফ্রান্সের সরকারি ব্যয়, অর্থনীতি ও আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও