
নোবেল শান্তি পুরস্কার সাধারণত একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি। কিন্তু কখনো কখনো একটি পুরস্কার একজন ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে একটি নীতি, একটি আদর্শ কিংবা একটি সময়ের জন্য বিশেষ বার্তা হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনবিদ ও বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইকে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি আমার কাছে তেমনই একটি বার্তা।
তিনি একজন আইনবিদ। আইনের সঙ্গে যুক্ত একজন মানুষ হিসেবে তাঁর এই স্বীকৃতির মধ্যে আমি ব্যক্তিগত এক ধরনের আনন্দ অনুভব করি। কারণ এমন এক সময়ে একজন আইনবিদ শান্তিতে বিশ্বের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেলেন, যখন আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই পৃথিবীজুড়ে কঠিন প্রশ্ন উঠছে।
নোবেল কমিটি তাঁকে পুরস্কৃত করেছে ‘শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার জন্য’। এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই তাঁর প্রায় ছয় দশকের কর্মজীবনের দর্শন লুকিয়ে আছে।
বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আদালত থেকে আন্তর্জাতিক আদালত
নাভি পিল্লাইয়ের জীবন শুরু থেকেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী apartheid ব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠা ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত এই নারী ১৯৬৭ সালে তৎকালীন Natal প্রদেশে নিজের আইনচর্চা শুরু করা প্রথম নারী হন। তিনি Nelson Mandela-সহ apartheid-বিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের পক্ষে আইনি লড়াই করেছেন এবং বন্দিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন।
পরে তাঁর কর্মক্ষেত্র দক্ষিণ আফ্রিকার আদালত ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় বিস্তৃত হয়।
তিনি International Criminal Tribunal for Rwanda-তে বিচারক এবং পরে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরবর্তীতে তিনি International Criminal Court-এর বিচারক হন। দায়িত্ব পালন করেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও।
অর্থাৎ তাঁর কর্মজীবনের একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা আছে - ক্ষমতার বিপরীতে আইন, নিপীড়নের বিপরীতে মানবাধিকার এবং দায়মুক্তির বিপরীতে জবাবদিহি।
গাজা এবং সত্য বলার সাহস
সাম্প্রতিক সময়ে নাভি পিল্লাইয়ের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে গাজাকে কেন্দ্র করে।
তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের Independent International Commission of Inquiry-এর নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিশন গাজায় সংঘটিত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী এবং ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার বিশেষ অভিপ্রায়ের প্রমাণ রয়েছে।
এটি অত্যন্ত গুরুতর আইনি সিদ্ধান্ত এবং স্বাভাবিকভাবেই প্রবল রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং কমিশন ও জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছে।
কিন্তু নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর পিল্লাই যে কথাটি বলেছেন, সেটি আমাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে।
গাজার বিষয়ে সত্য বলার জন্য তাঁকে সাহসী বলা হচ্ছে শুনে তিনি প্রশ্ন করেছেন - সত্য বলতে সাহসের প্রয়োজন হবে কেন?
এই প্রশ্নটি শুধু গাজা নিয়ে নয়।
এটি আমাদের সময়ের আন্তর্জাতিক আইনের সংকট নিয়ে।
যদি একজন বিচারক বা মানবাধিকার তদন্তকারীকে আইনের ভিত্তিতে একটি অস্বস্তিকর সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য ‘সাহসী’ হতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে - আমরা কি এমন এক পৃথিবীতে পৌঁছেছি যেখানে সত্যের চেয়ে রাজনৈতিক সুবিধা বেশি শক্তিশালী?
আইন যদি শুধু দুর্বলের জন্য হয়
আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো এর অসম প্রয়োগ।
বিশ্বে আইন আছে। Geneva Conventions আছে। Genocide Convention আছে। International Criminal Court আছে। International Court of Justice আছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো - এসব প্রতিষ্ঠান এবং আইন কি শক্তিশালী ও দুর্বল সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হতে পারে?
কোনো দুর্বল রাষ্ট্র বা পরাজিত পক্ষের অপরাধের বিচার করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু যখন অভিযোগটি কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র, বড় শক্তির মিত্র কিংবা ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে ওঠে, তখন আইনের সঙ্গে রাজনীতির সংঘাত শুরু হয়।
নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল পুরস্কার সেই কারণেই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়।
এটি এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক বিচার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি। আইনকে মানা হবে কি না, সেটিও অনেক সময় রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কিন্তু আইন যদি কেবল আমার প্রতিপক্ষের জন্য হয়, তাহলে সেটি আর আইনের শাসন থাকে না।
আইনের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় তখনই, যখন একই নীতি নিজের বন্ধু, মিত্র কিংবা নিজের পক্ষের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করতে হয়।
গাজা থেকে রোহিঙ্গা
বাংলাদেশিদের জন্য নাভি পিল্লাইয়ের কাজের আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
তিনি বর্তমানে International Court of Justice-এ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় ad hoc বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশ বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। ফলে genocide, accountability এবং international justice আমাদের জন্য দূরের কোনো একাডেমিক আলোচনা নয়।
রুয়ান্ডা, গাজা কিংবা মিয়ানমার - ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্ন, ইতিহাস ভিন্ন, সংঘাতের প্রকৃতিও ভিন্ন।
কিন্তু একটি প্রশ্ন সর্বত্র একই - ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষ বিচার পাবে কি না?
এখানেই আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজনীয়তা।
শান্তি এবং ন্যায়বিচার কি আলাদা?
আমরা প্রায়ই শান্তির কথা বলি এমনভাবে, যেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
কিন্তু ন্যায়বিচারহীন শান্তি কতটা টেকসই?
কোনো জনগোষ্ঠী যদি হত্যা, নির্যাতন কিংবা বাস্তুচ্যুতির শিকার হয় এবং অপরাধের কোনো জবাবদিহি না থাকে, তাহলে শুধু অস্ত্র নীরব হওয়াকে কি প্রকৃত শান্তি বলা যায়?
আমার কাছে নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা এখানেই।
শান্তি এবং ন্যায়বিচার পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য ন্যায়বিচার প্রয়োজন।
অপরাধের বিচার প্রতিশোধ নয়। বরং আইনের মাধ্যমে প্রতিশোধের চক্র বন্ধ করার একটি সভ্য প্রচেষ্টা।
একজন আইনবিদের কাছে আরেক আইনবিদের শিক্ষা
আইন পেশায় যুক্ত একজন মানুষ হিসেবে নাভি পিল্লাইয়ের জীবন থেকে আমার কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি তাঁর পদ-পদবি নয়।
তিনি বিচারক হয়েছেন, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হয়েছেন, আন্তর্জাতিক আদালতে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন।
কিন্তু এসব পরিচয়ের পেছনে যে নীতিটি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনকে এক সুতোয় বেঁধেছে, সেটি আরও গুরুত্বপূর্ণ - মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে আইনকে নীরব হতে দেওয়া যাবে না।
আইন শুধু আদালতের বই নয়।
আইন কখনো একজন রাজনৈতিক বন্দির শেষ আশ্রয়। কখনো গণহত্যার শিকার একটি জনগোষ্ঠীর বিচারের পথ। কখনো নির্যাতিত নারীর কণ্ঠ। কখনো নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত একটি শিশুর ভবিষ্যৎ ফিরে পাওয়ার দাবি।
আর সে কারণেই একজন আইনবিদের দায়িত্ব শুধু আইন জানা নয় - আইনের উদ্দেশ্যটিও মনে রাখা।
সবার উপরে মানুষ
গত কিছুদিন ধরে যুদ্ধ, ফিলিস্তিন এবং আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে ভাবতে গিয়ে একটি বিষয় বারবার মনে হয়েছে - আমরা মানুষের পরিচয় আগে দেখি, মানুষটিকে পরে দেখি।
কিন্তু মানবাধিকারের দর্শন ঠিক উল্টো কথা বলে।
একজন ফিলিস্তিনির জীবন যেমন মূল্যবান, একজন ইসরায়েলির জীবনও তেমনি মূল্যবান। একজন রোহিঙ্গার জীবন যেমন মূল্যবান, একজন ইউক্রেনীয়, সুদানি কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তের মানুষের জীবনও তেমনি মূল্যবান।
সবার রক্তের রং লাল।
একজন মায়ের সন্তান হারানোর কান্না তার জাতীয়তা জিজ্ঞেস করে না। মানুষের ব্যথা শেষ পর্যন্ত মানুষকেই স্পর্শ করে।
সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই- বহুল উচ্চারিত এই মানবিক বাণীটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের দর্শনের সঙ্গেও যেন একই জায়গায় এসে মিলে যায়।
রাষ্ট্রের সীমানা আছে। রাজনীতির পক্ষ আছে। ধর্ম ও জাতিগত পরিচয় আছে।
কিন্তু মানুষের মর্যাদা যদি সত্যিই সর্বজনীন হয়, তাহলে ন্যায়বিচারও সর্বজনীন হতে হবে।
এই নোবেল তাই শুধু একটি পদক নয়
৮৫ বছর বয়সে নাভি পিল্লাই যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার খবর পেলেন, তখন তিনি ছিলেন জার্মানির ঐতিহাসিক Nuremberg courtroom-এ - সেই জায়গা, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি নেতাদের বিচার হয়েছিল।
ইতিহাসের কী আশ্চর্য সমাপতন।
যে আদালত আধুনিক আন্তর্জাতিক ফৌজদারি বিচারের অন্যতম প্রতীক, সেখানেই দাঁড়িয়ে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে জীবন কাটানো একজন আইনবিদ জানতে পারলেন - তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন।
তিনি পুরস্কারটি উৎসর্গ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার মানুষদের প্রতি।
আমার কাছে এই দৃশ্যের মধ্যেই ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের সবচেয়ে বড় অর্থটি রয়েছে।
এটি শুধু নাভি পিল্লাইয়ের প্রতি অভিনন্দন নয়।
এটি সেই সব আইনজীবী, বিচারক, মানবাধিকারকর্মী, তদন্তকারী এবং সাধারণ মানুষের প্রতিও সম্মান, যারা বিশ্বাস করেন - ক্ষমতা যত বড়ই হোক, মানুষের জীবন তার চেয়ে ছোট নয়।
নাভি পিল্লাইকে আন্তরিক অভিনন্দন।
একজন আইনবিদ হিসেবে তাঁর অর্জনে আমি আনন্দিত। একজন মানুষ হিসেবে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
আর তাঁর নোবেল আমাদের আবার মনে করিয়ে দিক -
শান্তির জন্য শুধু যুদ্ধ থামানো যথেষ্ট নয়। ন্যায়বিচারও প্রয়োজন।
কারণ আইন যখন ক্ষমতার সামনে নীরব হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে দুর্বল মানুষের কণ্ঠটিও হারিয়ে যায়।
আর আইন যখন মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন একটি আদালতের রায়ও কখনো কখনো শান্তির পথে একটি পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত শান্তির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হয়তো অস্ত্রের ভারসাম্য নয় - ন্যায়বিচারের ওপর মানুষের বিশ্বাস।
লেখক: নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল
আইনবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
কর্মকর্তা - বিচার মন্ত্রণালয়, যুক্তরাজ্য