যুক্তরাজ্য

Guardian
২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১১
আরও খবর

‘মেড ইন ইউরোপ’ কর্মসূচিতে প্রবেশাধিকার পেলে ইইউ শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে £৪৫০ মিলিয়ন ব্যয়ে প্রস্তুত যুক্তরাজ্য

17447_Untitled-1.jpg

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ কমিয়ে ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে আনার পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার। এ জন্য প্রয়োজনে বছরে সর্বোচ্চ ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত ব্যয় করতেও প্রস্তুত রয়েছে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সরকার। তবে এই সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে বড় একটি শর্ত রেখেছে যুক্তরাজ্য। ইউরোপের প্রস্তাবিত ‘মেড ইন ইউরোপ’ শিল্প কর্মসূচিতে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে দেশীয় শিক্ষার্থীদের সমপরিমাণ টিউশন ফি দেওয়ার সুযোগ দিতে চায় যুক্তরাজ্য। বর্তমানে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বার্ষিক টিউশন ফি অনেক ক্ষেত্রে ৬০ হাজার পাউন্ড ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে দেশীয় শিক্ষার্থীদের জন্য এই ফি বছরে ৯ হাজার পাউন্ডের কিছু বেশি। ইইউর পক্ষ থেকে তাদের শিক্ষার্থীদের জন্যও এই কম ফি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের ফি কমানোর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে আয় কমে যাবে, তা সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে পূরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ব্যয়ের হিসাবও তৈরি করেছে। সবচেয়ে ব্যয়বহুল পরিস্থিতিতে বছরে ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, প্রকৃত ব্যয় এর চেয়ে কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের একজন কর্মকর্তা এই অঙ্ককে এখনো অনুমাননির্ভর বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে যুক্তরাজ্য সরকার এই সুবিধা দিতে আগ্রহী হলেও বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে চায়। বিশেষ করে ‘মেড ইন ইউরোপ’ শিল্প কর্মসূচিতে যুক্তরাজ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই এখন ব্রিটিশ আলোচকদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই কর্মসূচির আওতায় ইউরোপীয় শিল্প ও উৎপাদন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোর পণ্যের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের আশঙ্কা, এই কর্মসূচির বাইরে থাকলে ব্রিটিশ গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর মতো সমান সুযোগ পাওয়ার নিশ্চয়তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের ফি কমানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চায় না যুক্তরাজ্য।

আগামী ২০ নভেম্বর ব্রাসেলসে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সম্মেলনকে সামনে রেখে কয়েক মাস ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলছে। কার্বন নিঃসরণ বাণিজ্য, কৃষিপণ্য এবং তরুণদের চলাচল ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে সমঝোতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে।

আলোচনার অংশ হিসেবে ইউরোপের সর্বোচ্চ ৮০ হাজার তরুণকে যুক্তরাজ্যে বসবাস, কাজ ও পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। তবে ইইউর কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্র এই সংখ্যা এক লাখ থেকে দেড় লাখ করার দাবি জানিয়েছে।

এ ছাড়া সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন তথ্যভান্ডারে যুক্তরাজ্যের প্রবেশাধিকার নিয়েও আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের আঙুলের ছাপ সংরক্ষিত থাকা ‘ইউরোড্যাক’ তথ্যভান্ডারে যুক্তরাজ্যের প্রবেশাধিকার পুনরায় চালুর বিষয়ে আগ্রহী ব্রিটিশ সরকার। এই তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে আশ্রয়প্রার্থীদের পরিচয় ও চলাচলসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি পলাতক ব্যক্তি, নিখোঁজ মানুষ এবং চুরি হওয়া সম্পদের তথ্য সংরক্ষিত থাকা শেনজেন ইনফরমেশন সিস্টেমেও প্রবেশাধিকার চায় যুক্তরাজ্য।

এদিকে সাবেক ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভস ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলবেন, যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক স্বার্থ, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং ভৌগোলিক বাস্তবতা ইউরোপের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

ইইউ শিক্ষার্থীদের কম টিউশন ফি দেওয়ার প্রস্তাবটি যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরে বিতর্ক তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, দেশটির অনেক স্নাতক শিক্ষার্থী বর্তমানে নিজেদের স্টুডেন্ট লোন পরিশোধের নিয়ম পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ফি কমানো এবং ব্রিটিশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ইউরোপীয় বাজারে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, এই দুই ইস্যুতে সমঝোতাই এখন যুক্তরাজ্য-ইইউ আলোচনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকাশের আগে সম্পাদনা-সংক্রান্ত নোট: ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের অঙ্কটি চূড়ান্ত সরকারি বরাদ্দ নয়, এটি সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ব্যয়ের একটি হিসাব। তাই সংবাদে অনুমান হিসেবে উপস্থাপন করাই যথাযথ।

সর্বাধিক পঠিত


আরও খবর
ভিডিও